সর্বশেষ সংবাদ :

‘আমি আর এই মুখ দেখাতে পারব না’

Share Button
12_140319
বীথি রানী মন্ডল

রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ১৭ অক্টোবর ২০১৪।

সকালে হামার ম্যায়াটা কলেজত থ্যাকা পাইভেট পোড়া বাড়িত ফিরিছিল। ম্যায়াটার শরীলত জ্বর ছিল। বাড়িত ঢুক্যা জ্বরের অষুধ খ্যালো। বুঝা পারিনি কখন কাপত (কাপ) কর‌্যা বিষ ঢ্যালা খাছে। ম্যায়াটা হামার সুন্দর। ওই সুন্দরের জন্য শয়তানি করে হামার ম্যায়াক ম্যারা ফেললো শয়তানেরা।’ মাধবী রানী মণ্ডলকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আজ আর কারো নেই। কলেজছাত্রী মেয়ের মৃত্যুতে তিন দিন ধরে কেঁদেই চলেছেন তিনি। শত চেষ্টায়ও একদানা খাবার কেউ তাঁকে খাওয়াতে পারছে না।

বীথির কৃষক বাবা সঞ্জিত চন্দ্র মণ্ডল যেন নির্বাক হয়ে গেছেন। চার বছরের রিতু বোনের মৃত্যুর বিষয়টি কতটা বুঝতে পারছে তা বোঝা না গেলেও সেও একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় দোহারী মহাশ্মশানে বীথির শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের দোহারী পূর্বপাড়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় গ্রামজুড়ে বিষাদের ছায়া। ফেসবুকে অশালীন ছবি পোস্ট করার জের ধরে ওই গ্রামের কলেজছাত্রী বীথি রানী মণ্ডল কীটনাশক পানে আত্মহত্যা করেছে। এ ব্যাপারে তার প্রেমিক নামধারী কলেজছাত্র হীরেন চন্দ্র মণ্ডল ওরফে রকিকে আসামি করে মহাদেবপুর থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা করা হয়েছে।

বীথির বাবা সঞ্জিত চন্দ্র মণ্ডল বলেন, তাঁর মেয়ে উপজেলা সদরের জাহাঙ্গীরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের কমার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিল। তার সঙ্গে জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজের ছাত্র বৃন্দারামপুর গ্রামের বীরেন চন্দ্র মণ্ডলের ছেলে হীরেন ওরফে রকির বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সেই সুযোগ নিয়ে বীথিকে অন্তরঙ্গ ছবি তুলতে বাধ্য করে। সম্প্রতি তাদের সম্পর্কের অবনতি হলে হীরেন সেই ছবিগুলো ফেসবুকে পোস্ট করে। বিষয়টি জানতে পেরে লজ্জায় বীথি মঙ্গলবার দুপুরে কীটনাশক পান করে। তাকে প্রথমে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাত ৩টার দিকে তাকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে বুধবার ভোরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে বীথি মারা যায়। বিষয়টি জানানো হলে মহাদেবপুর থানার পুলিশ বিকেলে তাঁর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। জাহাঙ্গীরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ নাজিম উদ্দিন মিয়া বলেন, বীথি তাঁর কলেজে প্রথম বর্ষ বাণিজ্য বিভাগের ছাত্রী ছিল। এসব ব্যাপারে সে কখনো কোনো অভিযোগও করেনি। শ্রেণিশিক্ষকরা তাঁকে জানিয়েছেন, বীথি ছিল চাপা স্বভাবের।

বীথির ছোট কাকা মিলন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘বিষপানের আগে বীথি বলেছিল, আমি আর এই মুখ দেখাতে পারব না। কাল থেকে আমি কলেজেও যাব না। মোবাইলে ছবি দেখে আর মানুষের কথা শুনে ঘেন্না ধরে গেছে।’

এলাকাবাসী জানায়, রকি ছিল একজন বখাটে। বীথির বাড়ি থেকে জাহাঙ্গীরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। ওই পথে লোক চলাচলও অনেকটা কম। রকি প্রায়ই বীথির পিছু পিছু তার বাড়ি পর্যন্ত আসত। এদিকে সদরের দুলালপাড়ায় রকিদের বাড়িতে গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায় বাড়ির সদরের লোহার গেটটি ভেতর থেকে বন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পর ভেতর থেকে দরজা খুলে ১০-১২ বছরের একটি ছেলে বেরিয়ে আসে। সে জানায়, বাড়িতে কেউ নেই। ওই বাড়ির মালিক বীরেন চন্দ্র মণ্ডল তার মেসো হন।

মহাদেবপুর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, বীথির নগ্ন ছবি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে প্রকাশ করার কারণেই সে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs