সর্বশেষ সংবাদ :

জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপে সরকার

Share Button

index21

রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ১৯ জানুয়ারী, ২০১৫।

গেল ৫ জানুয়ারি থেকে প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীসহ দেশের কোনো কোনো এলাকায় ঘটছে সহিংসতা। পেট্রল বোমার আঘাতে ঝলসে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। যানবাহনের চালক থেকে শুরু করে বাসের যাত্রীরা এ হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। সরকারের তরফে সহিংসতা বন্ধে চেষ্টার কথা বলা হলেও চোরাগুপ্তা হামলার কাছে যেন সবকিছু হেরে যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ যেমন উদ্বিগ্ন, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্বেগ এবং বিস্ময় প্রকাশ করতে পিছপা হচ্ছে না। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন বলছে, সংঘাত বা সহিংসতা থামাতে হবে। আর এতে পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো। তাদের একটাই কথা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের জীবনহানি উদ্বেগজনক। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশ আছে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য, তবে যারা সহিংসতা করছে তাদের ওপর চাপ দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মহল ও বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা রাখতে হবে। নবম সংসদের বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নেয়ার বাস্তবতায় এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় গত বছরের ৫ জানুয়াারি অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের পর দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো নতুন নির্বাচনের দাবি তোলে। গত ৫ জানুয়ারিকে ঘিরে বিএনপি কর্মসূচি দেয় এবং দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গুলশানের দলীয় কার্যালয়ে ‘অবরুদ্ধ’ থাকেন। এর পর আসে অবরোধ, টানা অবরোধ ও হরতাল। শুক্রবার অবরোধের ১১তম দিন পর্যন্ত অর্থাৎ ৪ থেকে ১৬ জানুয়ারি সারাদেশে পেট্রল বোমা ও আগুনে ১১ জন, সংঘর্ষে ৯ জনসহ মোট ২৫ জন নিহত হয়েছেন। আগুন ও ভাঙচুরের কবলে পড়েছে ৫১৫টি যানবাহন। এছাড়া ৪ দফায় রেলে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে।

সূত্র মতে, গত বুধবার ঘটেছে সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধটি। ওই দিন ২০ দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধের ৯ম দিনে রংপুরের মিঠাপুকুরে বাসে পেট্রল বোমা হামলায় জীবন্ত দগ্ধ হয়ে এক শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। একই দিন বুধবার মধ্যরাতে গাজীপুরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসে আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছেন বাসের হেলপার তোফাজ্জল হোসেন। এছাড়া ছয় দিন আগে মগবাজারে দগ্ধ প্রাইভেট কারচালক আবুল কালাম হাওলাদার মারা গেছেন বৃহস্পতিবার।
সহিংসতায় প্রাণহানিতে সরব হয়ে উঠেছেন বিদেশিরা। কর্মসূচি দিয়ে কোনো দল ক্ষমতাসীন হবে সে বিষয়ে তারা চুপ থাকলেও সহিংসতার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে পিছপা হচ্ছেন না। তারা তাদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় সহিংসতা পরিহারে রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপ দিতেও প্রস্তুত আছেন।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, গেল কয়েকদিন কূটনীতিকদের ‘বডি ল্যাংগুয়েজে’ অনেক কিছু অনুমান হলেও বুধবার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পৃথক বিবৃতিতে সহিংসতার বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
অন্যদিকে, শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশের প্রধান দুই দল তাদের মতপার্থক্য শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানে ব্যর্থ হওয়ায় রাজনৈতিক সহিংসতা যে মাত্রায় পৌঁছে তা উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতায় বাংলাদেশে প্রাণহানির ঘটনার ‘নিরপেক্ষ ও কার্যকর’ তদন্ত করতে হবে।
সহিংসতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেরি হার্ফের আগে এক বিবৃতিতে বলেছেন, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে বাংলাদেশে সহিংসতা চালানোর আমরা নিন্দা জানাই। আমরা সব দলকে সংযত আচরণ করতে এবং সহিংসতা ও ভীতিপ্রদর্শন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।
ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস বলেছে, আমরা সারাদেশে হতাহতের ঘটনায় মর্মাহত। আমরা ভুক্তভোগী পরিবারদের গভীর সমবেদনা জানাই। আমরা সব পক্ষের সহিংসতার নিন্দা জানাই।
ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট ডব্লিউ গিবসন বলেছেন, আমি রংপুর জেলায় বাসে অগ্নিসংযোগের ফলে কয়েকজন যাত্রীর মৃত্যু এবং আহত হওয়ার সংবাদসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান সহিংসতার ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, আমি প্রাণহানি ও আহত হওয়ার সংবাদে গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
এছাড়া গত সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর ব্রিফকালে ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ডেলিগেশন প্রধান চলমান সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
সার্বিক বিষয়ে সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, সহিংসতা বন্ধ এবং জনগণের যানমাল রক্ষার্থে সরকার সচেষ্ট আছে এবং থাকবে। এ লক্ষ্যে উচ্চ পর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সর্বোচ্চ নির্দেশ দেয়া আছে। পাশাপাশি রয়েছে সরকারের এক সপ্তাহের মিশন।
এ প্রসঙ্গে আইজিপি একেএম শহীদুল হক বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে পুলিশ কঠোর হয়ে দায়িত্ব পালন করছে। এ দায়িত্ব পালনে জনগণকে পুলিশের সহযোগিতা করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, যারা এই চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশকে অবহিত করতে হবে। জনগণ যদি পুলিশকে সহযোগিতা করে তাহলে পুলিশ সহজে নাশকতাকারীদের আইনের আওতায় আনতে পারবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সহিংসতা নিয়ে দেশে যেমন উদ্বেগ রয়েছে, তেমনিভাবে বিদেশিদের উদ্বেগ যদি রাজনৈতিক দলগুলো আমলে নেয় তাহলে দেশে শান্তি আসবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। মনে রাখতে হবে জানমালের নিরাপত্তায় যথাসাধ্য চেষ্টা চলছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছেন, সহিংসতা বন্ধে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, সমাধান শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না। সরকারের দায়িত্ব জনগণের জানমাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা করাটাও সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, দেশের গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ ধরনের কর্মসূচি কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না। জ্বালাও-পোড়াও, সংঘর্ষ ও বিরোধী নেতাকর্মীদের হয়রানি করে কোনো পক্ষ লাভবান হবে না। বরং দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা আরো প্রকট হয়ে উঠবে।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs