সর্বশেষ সংবাদ :

সংলাপ না হলে চরম মূল্য দিতে হবে

Share Button

pic-15_136496

রিপোর্টারঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম,ঢাকা
০৩ অক্টোবর ২০১৪

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জাতি হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা যত কথাই বলুন না কেন, বিএনপির সঙ্গেই আলোচনা করতে হবে। অন্যথায় এই আওয়ামী লীগ সরকারকে অতীতের মতো চরম মূল্য দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘সংলাপ না হলে আবারও সংঘাত সৃষ্টি হবে। তাই গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের স্বার্থে আলোচনায় বসুন, সংলাপের আয়োজন করুন, সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করুন।’
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী ও বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমান।
নিউ ইয়র্ক সফর শেষে গতকাল বিকেলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতেই বিএনপি এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
পবিত্র হজ ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানকারী মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জাতি হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ওই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো কিছু আমরা পাইনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ থেকে বোঝা যায়, তিনি চতুরতার সঙ্গে লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।’
মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করলে সাত বছরের জেল হয়।
অথচ মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কটূক্তির পরও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মির্জা ফখরুল আরো দাবি করেন, অবিলম্বে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করে প্রচলিত আইনে তাঁর বিচার করতে হবে।
পবিত্র হজ সম্পর্কে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর মন্তব্য নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যে গতকাল বিকেলে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রিসভায় থাকছেন না। যেটা আমি বলেছি, সেটাই করব। তাকে মন্ত্রিসভায় রাখব না। সে থাকবে না।’
কবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে- এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মন্ত্রীকে বিদায় দিতে হলে কিছু নিয়ম মানতে হবে।
বর্তমানে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী দেশের বাইরে আছেন, কিভাবে গ্রেপ্তার হবেন- প্রশ্ন করা হলে বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, এ ক্ষেত্রে ইন্টাপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা যায়। এটা সরকার জানে। তিনি বলেন, মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়টির দায় সরকার কোনোভাবে এড়াতে পারবে না। আজ (গতকাল) সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ওই সব বক্তব্য লতিফ সিদ্দিকীর  ব্যক্তিগত ব্যাপার। এর দায় সরকার নেবে না। অথচ তিনি (আবদুল লতিফ সিদ্দিকী) এখনো মন্ত্রী আছেন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বিনা টেন্ডারে বিক্রি করে মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী লাভবান হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল।
সংলাপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যত কথাই বলুন না কেন, বিএনপির সঙ্গেই সংলাপ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যদি সংলাপ করতে না চান, তাহলে অতীতের মতো দেশে সংঘাত সৃষ্টি হবে। এ জন্যই আমরা বারবার বলছি, আর কালবিলম্ব না করে গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের স্বার্থে সংলাপে বসুন, যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিলম্ব করলে আপনাদের সময় থাকবে না।’
খুনি ও দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে কেন সংলাপ করব- প্রধানমন্ত্রীর এ রকম বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও অবৈধ অনৈতিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর এ রকম কথা শোভা পায় না। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতির রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
এ প্রসঙ্গে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রত্যাহার, পুঁজিবাজার, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষমতাসীনদের লুট করার বিষয় উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রবাসীদের মুখে মুখে আলোচনা হয়, ওই সব অর্থ বিদেশে পাচার করে আওয়ামী লীগের নেতারা বাড়ি-ফ্ল্যাট কিনেছেন। সুইস ব্যাংকে তাঁদের বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা পড়েছে। আমরা দাবি করেছিলাম এই ব্যাংকে অর্থ জমাকারীদের তালিকা প্রকাশ করতে। কিন্তু সরকারের সে ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই।’
খুন-গুমের তালিকা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের খুনি বলছেন। খুন কারা করেছে? ২০১৩ সালের শেষ তিন মাসে ৩০০ জনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হত্যা করেছে। গোটা দেশে তারা ৬৫ জন নেতা-কর্মীকে গুম করেছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই গুম হয়েছে ২৪ জন। শুধু তাই নয়, গত পাঁচ বছরে সরকার বিএনপির সহস্রাধিক নেতা-কর্মীকে খুন করেছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য টেলিভিশনে যতটুকু শুনেছি, তাতে মনে হয়েছে, তিনি চিরাচরিত অভ্যাসমতো অসত্য ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে অহংকারমূলক ও জনগণকে উপেক্ষা করার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, এই সরকার ও সংসদ অবৈধ। তারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা দখলদার শক্তির মতো ক্ষমতা দখল করে আছে। উদ্দেশ্য একটাই- ২০৪১ সাল পর্যন্ত জোর করে, বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকা। তারা আগে বলেছিল ২০২১ সাল, এখন বলছে ২০৪১ সাল পর্যন্ত। এ জন্যই সরকার সর্বত্র অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
মির্জা ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, ‘১৮৫ জনের বহর নিয়ে অবৈধ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্ক সফর করেছেন। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনগণের শক্তি নিয়ে সেখানে গেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর জনগণের শক্তি ছিল না বলেই বিশাল বহর নিয়ে গেছেন।’
ফখরুল বলেন, ‘আমাদের দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে মামলায় আদালত কর্তৃক খালাস পেয়েছেন, সেই সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, তা আদালত অবমাননার শামিল। আজ পর্যন্ত তাঁর (তারেক রহমান) বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কোনো মামলার সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি কেউ।’
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়া সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন ফখরুল।
একই সঙ্গে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনসহ বিভিন্ন খাতে অগ্রগতি ও উন্নয়নের পেছনে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে যেসব উন্নয়নের কথা বলেছেন, পরিসংখ্যান  ও অর্থনৈতিক সূচক দেখলে বোঝা  যাবে, ওই সব উন্নয়নের সূচনা করেছেন জিয়াউর রহমানই। আর সেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী অভিযোগ করেন, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মিথ্যাচার করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে ভারত, চীন, নেপাল, আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানদের ১৫ মিনিট করে বৈঠক হলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি। জাতিসংঘ মহাসচিবের শিডিউলে এমন বৈঠকের বিষয়ে উল্লেখ নেই। জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর শনিবার পাঁচ মিনিট সময় বরাদ্দ ছিল যাকে ফটো অপরচুনিটি বলা হয়। পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো রকম কূটনৈতিক বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে এ দেশে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাসপোর্টেও এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কথা পরিষ্কার বলা আছে। এর মাধ্যমে তিনি দেশের আইন লঙ্ঘন করেছেন।
একটি মহল দেশের সুনাম ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা করছে : মির্জা আব্বাস
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, একটি কুচক্রি মহল দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা করছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে একসঙ্গে ঈদ ও পূজা পালিত হচ্ছে। কোনো সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা দেখা যায়নি। কিন্তু একটি কুচক্রি মহল এই সুনাম ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা করছে। দেশবাসীকে এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, মিশনের ধর্মগুরু শ্রীমৎ স্বামী ধ্রুবেষ আনন্দ মহারাজ, মহানগর বিএনপি নেতা কাজী আবুল বাশার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পরে মির্জা আব্বাস মতিঝিলের এজিবি কলোনির পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।
লতিফ সিদ্দিকীর যাবজ্জীবন শাস্তি দাবি মাহবুবের
হজ নিয়ে মন্তব্য করায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ‘বিচার বিভাগীয় তদন্ত’ ও ‘যাবজ্জীবন শাস্তি’ দাবি করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেছেন, কেবল মন্ত্রিসভা থেকে তাঁকে সরিয়ে দিলেই চলবে না। কেন তিনি এ ধরনের কথা বললেন, তারও তদন্ত করতে হবে। বিচার করে আইন অনুযায়ী তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে হবে। গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে জাতীয়তাবাদী নাগরিক দল আয়োজিত ‘বিচার বিভাগ, গণতন্ত্র ও আজকের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সৈয়দ মো. ওমর ফারুকের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা হায়দার আলী, বরকতউল্লাহ বুলু, আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, ব্যারিস্টার পারভেজ প্রমুখ।
লতিফ সিদ্দিকীর দায় সরকারকেই নিতে হবে : এম কে আনোয়ার
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এম কে আনোয়ার বলেছেন, লতিফ সিদ্দিকীর বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য শুধু মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে সরকার দায়মুক্ত হতে পারবে না। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতা ও মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের দায় সরকারকেই বহন করতে হবে।
গতকাল বিকেলে কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় স্থাপিত দুর্গা পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে এম কে আনোয়ার সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এ সময় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও হোমনা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান মোল্লাসহ বিএনপি নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs