সর্বশেষ সংবাদ :

লতিফ সিদ্দিকী ও প্রধানমন্ত্রীর যত অর্জন

Share Button

45734_480876018639497_1811827755_n

সম্পাদক-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম,ঢাকা
০৩ অক্টোবর ২০১৪

এইবার নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সপ্তমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিলেন। সাধারণ পরিষদ ছাড়াও তিনি জাতিসংঘের আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং বক্তব্য দিয়েছেন, যা জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ বিশ্বনেতারা অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। এর একটি ছিল বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির পরিণাম আর দ্বিতীয়টি জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা মিশন ও বাংলাদেশের ভূমিকা প্রসঙ্গ। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ভারতের নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও তাঁর বহু প্রতীক্ষিত বৈঠকটি করেছেন এবং ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়ে তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছেন। এই বছর ছিল জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য পদ লাভের চল্লিশ বছর পূর্তি। এই চল্লিশ বছরে বাংলাদেশের সব সরকারপ্রধান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একবার হলেও বক্তৃতা করেছেন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু প্রথমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ১১ মিনিট বক্তৃতা দিয়ে বিশ্বনেতাদের চমকে দিয়েছিলেন। শুধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার কারণে নয়; বরং বক্তৃতার বিষয়বস্তু বাছাইয়ের কারণে। এই ৪০ বছরে বাংলাদেশের পক্ষে যাঁরাই জাতিসংঘে বক্তব্য দিয়েছেন, নির্মোহভাবে চিন্তা করলে শেখ হাসিনার এইবারের অর্জন অন্য যেকেনোবারের তুলনায় অনেক বেশি ও তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনা গত ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্বসভার অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। সঙ্গে ছিলেন প্রায় ১৮০ সফরসঙ্গী, যাঁদের অর্ধেকের বেশি নিজেরাই নিজেদের সব ব্যয় মিটিয়েছেন। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্ক ছেড়েছেন। ফেরার পথে দুদিন ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে অবস্থান শেষে বৃহস্পতিবার তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দুর্ভাগ্য, তিনি দেশে ফেরার আগেই তাঁরই মন্ত্রিসভার একজন হেভিওয়েট মন্ত্রী ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য টাঙ্গাইলের বিখ্যাত সিদ্দিকী ভ্রাতাদের একজন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নিউ ইয়র্কের বাঙালি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের টাঙ্গাইল সমিতির দেওয়া তাঁর এক সংবর্ধনা সভায় কিছু লাগামহীন বক্তব্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সব অর্জনের ওপর শুধু পানিই ঢেলে দেননি; বরং শেখ হাসিনার সরকার, তাঁর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও দলের শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকটা চরম বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, লতিফ সিদ্দিকী বিরোধী দল তো বটেই, দেশের সব রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী, সাধারণ মানুষের হাতে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য না চাইতেই সমালোচনার জন্য একাধিক মোক্ষম অস্ত্রও তুলে দিয়েছেন।

ওই সন্ধ্যায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য শুধু লাগামহীন ও বেপরোয়াই ছিল না, জ্যাকসন হাইটসের কয়েকজন পরিচিতজনের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করে জেনেছি, মন্ত্রীর কথা শুনে মনে হয়েছে, তিনি অনেকটা অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। কারণ তাঁর বেশির ভাগ বক্তব্যই ছিল অপ্রাসঙ্গিক ও বাচাল প্রকৃতির। তিনি মুসলমানদের পাঁচ ফরজের এক ফরজ পবিত্র হজ সম্পর্কে কটূক্তি করে বলেছেন, তিনি জামায়াতে ইসলামীর যত বিরোধী, তার চেয়েও বেশি বিরোধী হজ (নাউজুবিল্লাহ) ও তাবলিগ জামাতের। তাঁর মতে, এসব কর্মকাণ্ডে শুধু সময় ও অর্থের অপচয় হয়। পবিত্র ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজ সম্পর্কে এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য এর আগে অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর বা এমনকি কোনো নাস্তিকের কাছ থেকেও শোনা যায়নি। তিনি যেদিন এই বক্তব্য দিচ্ছিলেন, সেদিন বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ হজ পালনের জন্য পবিত্র মক্কার উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার হজব্রত পালন করেছেন। প্রতিবছর যেসব মানুষ প্রতারকদের খপ্পরে পড়ার কারণে হজে যেতে পারেন না, তাঁদের সরকারি খরচে হজে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। আর লতিফ সিদ্দিকী নিজেও ১৯৯৮ সালে হজ পালন করেছেন। এই বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক লাখ মানুষ হজে যান। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সৌদি আরব আমাদের স্বীকৃতি না দেওয়ায় এই দেশের মানুষের হজে যাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নতুন দেশের নাগরিকদের হজে যাওয়াটা নির্বিঘ্ন করার জন্য বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগতভাবে সৌদি আরবের বাদশাহর কাছে চিঠি লিখে তাঁর বিশেষ অনুমতি আদায় করেন। বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিমপ্রধান দেশ এবং এই দেশের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। তাঁর বক্তব্যে তিনি হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কেও অসম্মানজনক কথা বলেছেন। পবিত্র হজ সম্পর্কে তাঁর ধারণা শুধু একজন গণ্ড মূর্খের ধারণার সঙ্গেই তুলনা করা যায়। লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য দেশের সব মুমিনের ধর্মানুভূতিতে প্রচণ্ড আঘাত করেছে। তিনি নিশ্চয়ই জানেন, বঙ্গবন্ধুই তাবলিগ জামাতকে বিশ্ব ইজতেমার জন্য তুরাগপাড়ে বিশাল ভূমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। এই মন্ত্রীর লাগামহীন বক্তব্য হজ বা তাবলিগ জামাত নিয়ে বক্রোক্তিতে থেমে থাকেনি। তিনি প্রবাসীদের কামলা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলেছেন, যাঁদের কাছে চার লাখ টাকা চাঁদা চাই, তাঁরা যদি এক লাখ টাকা চাঁদা দেন তাঁদের তদবির করি না। প্রধানমন্ত্রী তনয় ও তাঁর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে কটাক্ষ করে বলেন, ‘জয় ভাই আবার কে? তিনি তো সরকারের কেউ নন। তাঁর তো কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই।’ স্থানীয় বাংলা পত্রিকাগুলোকে তিনি টয়লেট পেপারের সঙ্গে তুলনা করে সাংবাদিকদের বিনা কারণে অশালীন ভাষায় অপমানিত করেন। দেশের টক শো সম্পর্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে যাঁরা টক শোতে অংশগ্রহণ করেন, তাঁদের সম্পর্কে বাজে সম্বোধন করে বলেন, তাঁরা হলেন ‘টকমারানি’। তিনি ভুলে গিয়েছেন, তিনি নিজেও একাধিকবার বিভিন্ন টক শোতে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর সহকর্মীরা নিয়মিত টক শোতে অংশগ্রহণ করেন। আবুল মাল আবদুল মুহিত, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মঈনুদ্দিন খান বাদল, অপু উকিল, নুরজাহান মুক্তাসহ অনেক সংসদ সদস্য ও দলীয় কর্মী টক শোতে দর্শকনন্দিত। টক শো সম্পর্কে এ ধরনের ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করার কোনো অধিকার আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর নেই।

মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী যখন নিউ ইয়র্কে এসব বালখিল্যসুলভ বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী লন্ডনের পথে। হিথরোতে নেমেই তিনি তাঁর মন্ত্রিসভার এই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের বাচালতাপূর্ণ বক্তব্য সম্পর্কে অবহিত হন এবং দ্রুততম সময়ে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এর ফলে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছেন এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর প্রতি মানুষের আস্থা ও সমর্থন বহু গুণে বেড়ে গেছে। লতিফ সিদ্দিকীর ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। তিনি সরকারের অন্যান্য মন্ত্রী ও দলের সদস্যদের সম্ভবত এই মেসেজ দিতে চেয়েছেন, কেউ যেন নিজেকে অপরিহার্য বা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে না ভাবেন, যা সরকার ও দলের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। স্বাভাবিক কারণেই লতিফ সিদ্দিকীর মন্তব্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। সবাই মন্ত্রিসভা থেকে তাঁর অপসারণ দাবি করেছেন। অনেকে তাঁর সংসদ সদস্যপদও বাতিল চেয়েছেন। কেউ কেউ তাঁর গ্রেপ্তার দাবি করেছেন। হেফাজতে ইসলাম তাঁকে মুরতাদ ঘোষণা করেছে এবং তাঁকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে তওবা করতে বলেছে। সারা দেশে তাঁর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৯টি মামলা ও একটি রিট হয়েছে। নিজ দল আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রায় সব অঙ্গসংগঠন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছে। মির্জা ফখরুল যথারীতি লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবস্থায় ধূম্রজাল আবিষ্কার করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভার একজন সদস্য অপসারিত হলে বা তিনি পদত্যাগ করলে ওই ব্যক্তির ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে (পদত্যাগপত্র) ব্যক্ত করবেন অথবা তাঁকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিলে প্রধানমন্ত্রী অপসারণের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করবেন এবং রাষ্ট্রপতি সেই মর্মে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, যা পরবর্তীকালে প্রজ্ঞাপন হিসেবে জনবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রচারিত হবে। লতিফ সিদ্দিকী বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং তাঁর দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করার কোনো প্রশ্নই আসে না। সুতরাং তাঁকে প্রধানমন্ত্রী অপসারণই করবেন। এখানে ধূম্রজাল সৃষ্টির কোনো অবকাশ নেই। কারণ যখন এসব ঘটনা ঘটছিল তখন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দুজনই দেশের বাইরে। যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী মেক্সিকোর গুয়াডালাহারা শহরে যাচ্ছিলেন বাংলাদেশকে প্রদত্ত ‘উইটসা-২০১৪ গ্লোবাল আইসিটি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করতে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। পথে লতিফ সিদ্দিকী জানতে পারেন, তিনি আর মন্ত্রী নেই। মেক্সিকোতে বাংলাদেশের পক্ষে মঞ্চে উঠে অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন প্রতিমন্ত্রী পলক, লতিফ সিদ্দিকী নন। মির্জা ফখরুলের ধূম্রজাল আবিষ্কারের কোনো কারণ দেখি না।………………

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs