সর্বশেষ সংবাদ :

পরিবর্তন আসবে না কি আসবে না

Share Button
খালেদা-হাসিনা1
রিপোর্টঃ-মোঃ আরিফ আহাম্মেদ
ঢাকা, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৪।
প্রফেসর ড. মখদুম মাশরাফী : বুঝতে পারছি রাষ্ট্রকাঠামো বদলাবে না। অবস্থারও পরিবর্তন ঘটবে না। এটি সময় ও তার অন্তর্গত প্রক্রিয়ার নিজস্ব দায়। আমি রাজনীতিক নই যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেব। আমি রাজনীতির অধ্যাপক। তাই রাজনীতি বিষয়ক কথা বলবার বাধ্যতা আমার আছে। দায়িত্ব আমার আছে। আজকের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণভাবে কথার অন্তরার্থ ও আঙ্গিক ভর্ৎসনা ও ভজনের দ্বন্দ্বদোলার মধ্যে বিরাজিত। হয় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা অথবা নিন্দা, এ রকম একটি কথা-প্রেক্ষিত এ দেশে বিরাজ করছে। যুক্তির প্রযুক্তিগুলো তেমনিভাবে বিন্যস্ত হয়ে চলেছে। প্রায় সবাই ক্ষমতার পক্ষে-বিপক্ষে বলবার জন্যে উন্মুখ অথবা বাধ্য। উন্মুখতার কারণ সম্ভবত উচ্চাভিলাষ বা আহরণমুখিতা, সে পদ অথবা সম্পদ যেটির জন্যই হোক। অথবা ভয়। অনিরাপত্তার ভয়। বিষেশত ক্ষমতা প্রসঙ্গের ভয়। ক্ষমতায় আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না না ভঙ্গিতে, না না তীর্যকতায়, না না মুখিতায় , বিচিত্র গোষ্ঠী, ব্যক্তি, দল বিচিত্রভাবে ক্ষমতাধারী, এসবের কোনটাই বিপরীত ক্ষমতাবানদের কথা শুনতে ও মানতে রাজি নয়।
এর মোট যোগফল দাঁড়াচ্ছে বিশ্লেষণের দুর্ভিক্ষ ও যুক্তির বিকৃতি। ভয়ে অথবা লোভে এসব এমন হয়ে উঠছে। ফলে সমাজ হারাচ্ছে যুক্তির চর্চা ও শুদ্ধতা। নতুন প্রজন্ম সামাজিকীকরণের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত অসহায় হয়ে উঠছে যুক্তিবোধের চর্চায়। সমস্ত সমাজ প্রায় সামগ্রিকভাবে যুক্তি কাঠামোর বাইরে বেরিয়ে যেতে চলেছে। এটি ঠিক যুক্তি কাঠামোর বাইরে জীবনের ইতিবাচক চলমানতার কোন নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা নেই। যুক্তি কাঠামোর প্রয়োগ ও প্রভাবের বাইরে সমগ্র সমাজ একটি অচলায়তন হয়ে উঠতে বাধ্য। হয়েছেও তাই। সমাজে এখন যুক্তিশীলতার জায়গাটি গৌণ। এমন কি ক্ষেত্র বিশেষে পরিত্যাজ্য হয়ে উঠেছে। অনেক সময় যুক্তিশীল মানুষ এই নৈরাজ্যে বাধ্য হয়ে আপস করছে। এবং জেনে না জেনে যুক্তিহীনতার চর্চার শিকার হচ্ছে। এতে করে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ যেমন ব্যাপকভাবে বন্ধ্যায়িত হচ্ছে, তেমনি চাতুর্যের ক্ষেত্রটি প্রশস্ত হয়ে উঠছে। চাতুর্যই জীবনের মূল অবলম্বন হয়ে উঠছে। চাতুর্যের সঙ্গে নৈতিক ঘাটতির সম্পর্ক ওতোপ্রোত। তারও মহামারী দিন দিন ব্যাপকতর হচ্ছে। ব্যাষ্টি ও সমষ্টিকে যুগপৎ আক্রমণ করছে। এটি মহামারীর সংক্রমণের মতোই দ্রুতগামী ও সামগ্রিক। একটি অথৈ চাতুর্য বন্যায় ভেসে ও ডুবে যাচ্ছে সারা দেশ। এটি একটি নৈর্ব্যক্তিক, অমোঘ ও ভয়াবহ শক্তিতে পরিণত হচ্ছে প্রতিদিন নতুন নতুনভাবে।
স্বাধীনতার জন্য এটি একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ। কোন সেøাগানের আদর্শায়ন অথবা কোন আদর্শের আরোপের পথে এটি থেকে মুক্তি পাবার উপায় নেই। একমাত্র মূল্যবোধ প্রভাবমুক্ত সমাজতাত্ত্বিক-মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার পথেই এটি থেকে মুক্তি পাবার সম্ভাব্যতা রয়েছে। কিন্তু সে রকম গবেষণার উদ্যোক্তা কে হবেন, সেটিও একটি চ্যালেঞ্জ। বিদ্যা জগতে এ বন্যা যে ধস নামিয়েছে তা এক সময় অকল্পনীয় ছিল। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ না করে সনদপ্রাপ্তির উদগ্র আগ্রহ নকল চর্চাকে সামগ্রিক করে ফেলেছে, যেখানে কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থী একই পথের যাত্রী ও সহযাত্রী। বাণিজ্য বুদ্ধির উত্তুঙ্গতা বিদ্যানিকেতনগুলোকে বিদ্যাবন্ধ্যাত্বের মুক্ত আগারে পরিণত করেছে।
অথচ বিদ্যানিকেতনের গুণগত মানসম্পন্ন বিদ্যাই রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বিদ্যা বন্ধ্যা হয়ে যদি প্রজন্ম বিদ্যা নিকেতন থেকে সনদপ্রাপ্ত হয়ে বেরিয়ে আসে তাহলে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়তে বাধ্য। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীন থাকা পুরোপুরি নির্ভর করে বুদ্ধিবৃত্তিশীল দক্ষ ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনার ওপর। তা যদি নিশ্চিত না হয় তাহলে ঔপনিবেশিক শাসনের বাধ্যতা আসেই। কারণ, বৈশ্বিকরণের পরিপ্রেক্ষিতে কোন রাষ্ট্রই আজ বিশ্ববিচ্ছিন্ন নয়। ফলত, বিশ্বের অন্যত্র থেকে ব্যবস্থাপনা ও বুদ্ধিবৃত্তিশক্তি যে কোন রাষ্ট্রে ধাবিত হবে-এটিই নিয়তি। স্বাধীনতার সেøাগান ও ভাবাবেগ যতই প্রবল হোক বিদ্যা, যুক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও দূরদর্শিতা ছাড়া স্বাধীনতা কখনোই নিরাপদ নয়। কেন এমন হচ্ছে-এটি প্রবল একটি জিজ্ঞাস্য। সমাজে মেরুকরণ ধারার অন্ধ প্রাবল্যের ফলে এ জিজ্ঞাসা অবাঞ্ছিত হয়েই থাকছে। আমরা সবাই মিলে একটি অবধারিত ধস ধারায় নিবেদিত হয়ে আছি। আমরা একটি অমোঘ অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলেছি।
বিষেশত রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির আপেক্ষিক নিরুপক হওয়ায় এই অন্ধকারের ভয়াবহতা আরও তীব্র। গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিতর্ক ধারা তার উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কিন্তু তাকে তর্ক ধারায় নামিয়ে আনা হয়নি নিছক। তাকে ফিজিক্যাল ও ম্যানুয়্যাল স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। ক্ষমতা হয়ে উঠেছে অন্ধতা। ক্ষমতা হয়ে উঠেছে দানবীয় ও অমানবিকভাবে বেপরোয়া। যুক্তিশীলতার অভাবে রাজনীতি হয়ে উঠেছে এক ধরনের জাহিলিয়া ও জুলুমের বিষয়। এটি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রে সমানভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। এ কারণে রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রসারিত হয়ে গেছে প্রজ্ঞা পারম্পর্যের বাইরে যুক্তিহীন স্বৈরাচারিতায়। জীবনের বস্তু ঘনিষ্ঠতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতির অনিবার্যতা অনস্বীকার্য। সে অর্থে রাজনীতি স্বাধীনতার নিরুপক ও নির্ধারক। কিন্তু চাতুর্যের অতিশায়ণ, যুক্তির বন্ধ্যায়ন এবং এর কার্যকারণগত কারণে রাজনীতির কৌশল সর্বস্বতা ও অন্ধতা বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে প্রায় অকার্যকর করতে উদ্যত হয়েছে।
বিশ্বায়নগত কারণে বুদ্ধির ঋণগ্রস্ততা, অন্ধ আহরণমুখিতাকে সর্বগ্রাসী করে একটি রাষ্ট্রকে অবলীলায় বন্ধ্যা করে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি এমন কিছু ঘটছে, এটি তদন্তের বিষয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সারা দেশকে একটি বিশ্লেষণ কাঠামোর মধ্য দিয়ে আনার জন্য সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট হওয়া। এ জন্য বিচিত্র মাধ্যম আজ বিশ্বে বিরাজিত। সেগুলোর উদ্ঘাটন ও ব্যবহার খুবই জরুরি। না হলে আমাদের জীবন্ত গোরস্থানমুখিতা দ্রুত রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখনও অপরিণত। গণমাধ্যমে বিশ্লেষণের এলাকাটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে উঠেছে। না হলে গণমাধ্যমের পক্ষে সম্ভব ছিল যুক্তিশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তির পুনরুদ্ধারের আয়োজনকে সফল করা। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অতিরাজনীতিকৃত হওয়ায় বুদ্ধিবৃত্তির শুদ্ধতার ক্ষেত্রে বন্ধ্যা হয়ে আছে। অথচ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ই শ্রেষ্ঠ যা বুদ্ধিবৃত্তির গুণগত মানকে নিরাপদ ও উন্নততর করতে পারে। বর্তমান নির্বাচনসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে যুক্তি ও বুদ্ধির পথে চলা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও রয়েছে বাণিজ্য অগ্রাধিকার। তাই তাদের কাছে বুদ্ধিবৃত্তির শুদ্ধায়ণের ও গুণগত উত্তরণে ভূমিকা রাখা বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে দুরূহ।
লেখক : প্রাক্তন সভাপতি ও অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs