সর্বশেষ সংবাদ :

মহান বিজয় দিবস

Share Button

1982047_769729066408274_9032451003528659109_n

রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৪।

মহান বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। এ দিনটি জাতির জন্য পরম গৌরবের। একাত্তরে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ শেষে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করেছিল পাক হানাদার বাহিনী। চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের।

বিজয়ের অনুভূতি সবসময়ই আনন্দের। তবে একই সঙ্গে দিনটি বেদনারও। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের ফসল আমাদের বিজয়। এরই মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পায় স্বাধীনতা। তাই বাঙালি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের। একাত্তরে যেসব নারী সভ্রম হারিয়েছিলেন, শিকার হয়েছিলেন ভয়াবহ নির্যাতনের বাঙালি স্মরণ করে তাদের। এরই  ধারাবাহিকতায় ৪৩তম বার্ষিকীতে মঙ্গলবার সাভার জাতীয় স্মৃতি সৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবে বাঙালি।

এদিকে, ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্মরণ করব ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীকার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদেরও। এদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার তথা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কোটি কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন একই লক্ষ্যে অবিচল একদল রাজনৈতিক নেতা। স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমেও আমাদের জাতীয়তাবোধকে শাণিত করে তোলা হয়েছিল। একটি চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের মাধ্যমে এ জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়া ছিল অসম্ভব। তাই বাঙালি পেয়েছে স্বাধীনতা।

মহান এ স্বাধীনতা অর্জন করতে গিয়ে এ দেশের ত্রিশ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। প্রায় দুই লাখ নারীকে নির্যাতিত হতে হয়েছে। অসংখ্য বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। লুট হয়েছে অসংখ্য মানুষের অর্থ-সম্পদ ও গবাদিপশু।

একাত্তরের আগে আমরা ছিলাম পাকিস্তানের অধীনে। তারা আমাদের শাসন করতো, শোষণ করতো। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের এসব অন্যায় কিন্তু মুখ বুঁজে মেনে নেয়নি এ দেশের নেতারা, এ দেশের জনগণ। মাতৃভাষার জন্য রক্ত ঢেলে দেয়া বাঙালি শোষণ আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে সব সময়ই সোচ্চার থেকেছে। আর তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন বাঙালি নেতারা। তাদের মধ্যে ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ। তবে ১৯৬০-এর শেষদিক থেকে শেখ মুজিবুর রহমানই হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রধান নেতা। সারাদেশ তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে কাঁপিয়ে তোলে পাকিস্তানি শাসনের ভিত।
বাঙালিরা তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করল ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তার দল আওয়ামী লীগ একচ্ছত্র বিজয় অর্জন করল। কিন্তু এবারও সেই বঞ্চনার খেলা। বাঙালির হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন না পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এবারও বাঙালিরা পাকদের এ অন্যায় মেনে নিল না। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে তারা প্রথমে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আর অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর ২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পরই শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী যুদ্ধের পর আমরা বিজয় অর্জন করলাম। স্বাধীন হলো আমাদের দেশ, লাল-সবুজ পতাকায় শোভিত বাংলাদেশ।

আজ থেকে ৪৩ বছর আগে একরাশ স্বপ্ন বুকে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। চার দশকের বেশি সময়ের এ পথপরিক্রমায় সে স্বপ্নের কতটা পূরণ হয়েছে, আজ সে হিসাব মেলাতে চাইবে সবাই। এর মধ্যে আমাদের অনেক চড়াই-উৎরাই পেরুতে হয়েছে। রাজনীতি এগিয়েছে অমসৃণ পথে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায়। জনবহুল ও সীমিত সম্পদের এ দেশকে স্বয়ম্ভর করে তোলার কাজও সহজ ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দিনগুলোয় রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্র চালু করতে হয়েছিল। স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি সংবিধানও প্রণয়ন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশে নিরবচ্ছিন্ন যাত্রার। সদ্যস্বাধীন দেশের নেতৃত্বের এ বিষয়ে অঙ্গীকারের অভাব ছিল না।

যে কোনো জাতির শক্তির প্রধান উৎস ঐক্য। প্রায় সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন এটি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের পেছনে কাজ করেছিল মত-পথ-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ। এজন্যই সম্ভব হয়েছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মাত্র নয় মাসে পরাজিত করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর আমরা সে ঐক্য ধরে রাখতে পারিনি। গুরুত্বহীন বিষয়েও রাজনৈতিক বিভক্তি দেশে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার পথে বড় অন্তরায় হয়ে রয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের নেতৃত্বকে। সেই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় অভিন্ন নীতি অনুসরণ অপরিহার্য। আমাদের সামনে সম্ভাবনা অসীম। জাতীয় ঐক্য ছাড়া তা যথার্থভাবে কাজে লাগানো যাবে না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সব সমস্যা মোকাবেলায় সচেষ্ট হলে আমাদের অগ্রগতি ঘটবে দ্রুত। বিভেদ ভুলে আমরা সে পথেই অগ্রসর হব- এই হোক আমাদের বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs