সর্বশেষ সংবাদ :

দানেই আনন্দ, কুমিল্লার মুরাদনগরের আবুল হাশেম |

Share Button

রিপোর্টার:-দৈনিক মুক্তকন্ঠ,
০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০। সময ০৩,১০.  PM

এ পর্যন্ত মোটমাট ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে আবুল হাশেমের দানে। সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন আরও ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে। ব্যক্তিগত খাতেও একুশে পদকজয়ী এই সমাজসেবকের অনুদানের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ।
৮৯ বছর বয়সী আবুল হাশেমের স্বপ্নবিষয়ক এক আজব তথ্য শুনুন। যত দূর মনে করতে পারেন, তিনি নাকি জীবনে মোটে একবারই স্বপ্ন দেখেছিলেন! তাও আবার সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়। সেদিন দেখলেন, প্রয়াত মা অজিফা খাতুন তাঁর সামনে এসেছেন। মুখে হাসি। ব্যস, এতটুকুই। রাতে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন না দেখলেও আবুল হাশেম জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখেন; স্বপ্ন দেখে এসেছেন দীর্ঘ এই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে। তাঁর স্বপ্ন—বাংলাদেশের সব মানুষ একদিন স্বাবলম্বী হবে। অভাব থাকবে না কোনো ঘরে। নিজে ছিলেন বড় শিল্পপতি। সারা জীবন অর্জিত ধনসম্পদ তিনি দান করেছেন দুই হাত খুলে। তাই লোকে তাঁর নাম দিয়েছে—দানবীর হাজি হাশেম। এ বছর বাংলাদেশ সরকার একুশে পদক দিয়ে সম্মান জানিয়েছে এই সমাজসেবককে।

বেতন ৩০, দান ১৫
ছাত্রজীবনে প্রায়ই স্কুলে শিক্ষক-সংকট দেখা দিত। ডাক পড়ত ছাত্র আবুল হাশেমের। দায়িত্বটা পালন করতেন হাসিমুখেই। নিচের ক্লাসের ছেলেদের পড়াতে পড়াতে ভাবতেন, শিক্ষক হতে পারলে মন্দ হয় না। আবুল হাশেম এন্ট্রান্স পাস করলেন ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে, ১৯৪৩ সালে। তিন বছর বাদে পেশাজীবনে পা রেখেই একটা স্বপ্নপূরণ হলো তাঁর। শিক্ষক হিসেবে চাকরি নিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানায়। বেতন মাসে ৩০ টাকা। তখনো ‘বাবার হোটেলের’ সদস্য। তাই বেতনের ওই ৩০ টাকা পকেটেই থেকে যেত। চাইলেই তা উড়িয়ে দেওয়ার বিপুল অবকাশ। কিন্তু না, আবুল হাশেম পয়সা ওড়ানোর মতো মানুষ ছিলেন না কখনোই। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর দান-খয়রাতের হাতটা একটু লম্বা। নিজে উপার্জন করার পর তাই ওই হাতটা আরেকটু লম্বা হলো। প্রায় সমবয়সী লুৎফর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হলো একদিন। টাকা-পয়সার ভীষণ টানাটানি মিটফোর্ড হাসপাতালে এলএমএফ-পড়ুয়া ওই তরুণের। লেখাপড়া শিকেয় ওঠার জোগাড়। আবুল হাশেম সব শুনে বললেন, ‘আজ থেকে আপনাকে আমি প্রতি মাসে ১৫ টাকা করে দেব। আপনি পড়াশোনা চালিয়ে যান।’
সেই হলো শুরু। নিয়মিতভাবে লুৎফর রহমানকে বেতনের অর্ধেক টাকা দিয়ে গেলেন আবুল হাশেম। পাঁচ বছর বাদে লুৎফর রহমান পরিণত হলেন ডা. লুৎফর রহমানে। পুরোনো সেই স্মৃতি খুব ভালোভাবেই মনে করতে পারেন আবুল হাশেম, ‘নিয়মিতভাবে দানের কথা বললে, লুৎফর রহমানকে দেওয়া ওই দানই আমার প্রথম। আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। কেন জানি না, আমার কাছে টাকা কখনোই নিজের বলে মনে হয়নি। টাকা হাতে থাকলেই মনে হতো, কাউকে দান করি। আমার দানের ফলে হয়তো কেউ আরেকটু ভালো থাকবে। বিশেষ করে সেই সময় শিক্ষাক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ অনেক পিছিয়ে ছিল। তাই আমার বড় লক্ষ্যই ছিল শিক্ষা খাতে দান করা।’

দানেই আনন্দ
১৯৪৬-৪৮, এই দুই বছর স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানায় শিক্ষকতা করলেন আবুল হাশেম। ১৯৪৮ সালে যোগ দিলেন আদিল-খলিল অ্যান্ড কোম্পানিতে। বেতন বেশ খানিকটা বাড়ল সেখানে, মাসে ১৫০ টাকা। আট বছর কাজ করেছিলেন সেখানে। তবে সেখানে দায়িত্ব ছিল সন্ধ্যার পর থেকে। সারা দিন কোনো কাজ নেই। কী করেন কী করেন! বাড়ির আঙিনায় তুলে ফেললেন একটি বেড়ার ঘর। তারপর? বললেন আবুল হাশেম, ‘সেখানে গোড়াপত্তন করলাম আমার প্রথম ব্যবসার। প্রেস দিলাম একটা, নাম—গ্লোব প্রিন্টিং প্রেস। এরই মধ্যে টুকটাক দান-খয়রাতও চলতে থাকল। ১৯৫৪ সালে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে পরের বছর নতুন আরও দুটি ব্যবসা শুরু করলাম। নিউ ঢাকা ব্রেড ফ্যাক্টরি, হারিকেনের ফিতা, কাইতন—এসব তৈরি হতো সেখানে। আরেকটা হলো নিউমার্কেটে ওষুধের দোকান—রুমী মেডিকেল স্টোর। ভালোই চলতে থাকল সব ব্যবসা।’
ব্যবসা যখন ভালোই চলছে, তখন দান-খয়রাতের ব্যাপারে আরেকটু বড় কিছু করার চিন্তা করলেন আবুল হাশেম। তাঁর জন্মস্থান কুমিল্লা। ১৯৫৬ সালে সেখানকার কোম্পানীগঞ্জের মুরাদনগরে ভিত রচনা করলেন কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম হাইস্কুলের। এরপর কেটে গেল সাত বছরের মতো। এরই মধ্যে ওষুধের ব্যবসাটা ভালো না লাগায় বিক্রি করে দিলেন দোকানটা। ব্যবসায় খানিকটা পাখির মতো মন ছিল আবুল হাশেমের। দিনের পর দিন এক জায়গায়, এক কাজ করতে তাঁর ভীষণ অনীহা। যে ব্যবসাতেই হাত দিতেন, সোনা ফলত। তার পরও এক কাজ বেশি দিন চালিয়ে যাওয়া ধাতে ছিল না তাঁর। তাই ১৯৬২ সালে নামলেন নতুন বাণিজ্য অভিযানে। চালু হলো জবা টেক্সটাইল মিলস। একই বছরে আরেকটি সহপ্রতিষ্ঠান করিম ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনপোরেশনেরও গোড়াপত্তন হয়ে গেল। একই সঙ্গে চার-চারটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাকা ঘুরতে লাগল তুমুল বেগে!
বড় ব্যবসায়ী হিসেবে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল আবুল হাশেমের নাম। এ-ও এসে ধরল হাজারো আবদার আর অভাব-অভিযোগ নিয়ে। প্রায় সবার ডাকেই তিনি সাড়া দিলেন হাসিমুখে। ১৯৬৪ সালে কুমিল্লায় গড়ে তুললেন একটি মাদ্রাসা। ১৯৬৯ সালে মুরাদনগরে হাত লাগালেন একটি কলেজ স্থাপনের কাজে। আবুল হাশেমের স্মৃতিশক্তি যে কতটা ধারালো, তার প্রমাণ ওই কলেজ স্থাপনাবিষয়ক স্মৃতিচারণায় স্পষ্ট হয়। এখনো টাকা-পয়সা আর জমিজমার হিসাবপত্তর তাঁর ঠোঁটস্থ, ‘১৯৬৯ সালের কথা। ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে কোম্পানীগঞ্জে আট একর ৪০ দশমিক ৫০ শতক জমি কিনেছিলাম। সেখানেই ১৯৭০ সালে গড়ে তুলি কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম কলেজ। তখন সেখানে কোনো কলেজ ছিল না, তাই লোকজন ভারি খুশি হয়েছিল।’
এরপর এ পর্যন্ত মোটমাট ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে আবুল হাশেমের দানে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—কুমিল্লায় চাপিতলা অজিফা খাতুন হাইস্কুল, নুরুন্নাহার গার্লস হাইস্কুল, রামকৃষ্ণপুর কামাল স্মৃতি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, রামকৃষ্ণপুর কলেজ, ফেনীতে দক্ষিণ রাজেশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ রাজেশপুর গ্রাম জামে মসজিদ। এ ছাড়া আরও ১২টির মতো প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। কেবল প্রতিষ্ঠানই নয়, ব্যক্তিগত খাতেও আবুল হাশেমের অনুদানের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ।
পরের তরে
২০০৬ সালের ৬ ডিসেম্বর। প্রথম আলোর নারীমঞ্চ পাতার একটি প্রতিবেদনে চোখ আটকে গেল আবুল হাশেমের। প্রতিবেদনের শিরোনাম—‘ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার জন্য ভিক্ষে করেন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী আলেয়া বেগম’। ভাগ্যহত ওই পরিবারের কথা জানতে পেরে আবুল হাশেম ছুটলেন তাদের কাছে, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুটির পড়াশোনার দায়ভার তুলে নিলেন নিজের কাঁধে। এটা মাত্র একটা উদাহরণ; আবুল হাশেমের সমাজসেবার এমন নজির কম নয়। এভাবেই সারা জীবন দেশের আনাচকানাচে অনেক এলাকায়ই তিনি ছুটে বেরিয়েছেন ভাগ্যহতদের ডাকে। এখনো, এই পড়ন্ত বয়সেও সপ্তাহে অন্তত একটি দিন তাঁকে ঢাকার বাইরে বেরোতেই হয়। ঘুরতেও বড় ভালোবাসেন আবুল হাশেম। দেশে তো ঘুরছেনই, ঘুরে এসেছেন পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশেও।
‘নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। বিশেষ করে ১৯৯৯ সালে আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই পত্রিকা ঘেঁটে ঘেঁটে ভাগ্যহতদের খুঁজে বের করতে শুরু করি। কখনো হয়তো কোনো অন্ধ পরিবার, কখনো বা দারিদ্র্যপীড়িত মেধাবী কিংবা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে পেয়ে যাই। ছুটে যাই তাঁদের কাছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করি পাশে দাঁড়াতে।’ আবুল হাশেম বলছিলেন তাঁর নেশার কথা। হ্যাঁ, এ দানের অভ্যাস এখন নেশাতেই পরিণত হয়েছে! এখন বিভিন্ন বয়স ও পেশার প্রায় ৩০ জনকে অনুদান দিচ্ছেন তিনি। তাঁদের কেউ থাকেন সেই বাখরনগরে, কেউ বা চাঁপাইনবাবগঞ্জে আর কেউ বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অনুদান দিয়ে আসছেন নিয়মিত। শুধু অনুদান দিয়েই বসে থাকেন না আবুল হাশেম; খোঁজখবরও রাখেন নিয়মিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই মেয়েটা ঠিকমতো পড়ছে তো? কিংবা ঠাকুরগাঁওয়ের ওই ছেলেটাকে যে ভ্যান কিনে দিয়েছিলেন, তার সবকিছু চলছে তো ঠিকঠাক? তাদের কাছ থেকে যখন ভালো খবর পান, স্বভাবতই নিজেকে সার্থক মনে করেন আবুল হাশেম, ‘পটুয়াখালীর দুটি ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। ওদের আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। ওদের অনুদান দিয়েছিলাম আমি। বছর কয়েক আগে পড়াশোনা শেষ হয়েছে ওদের। ওরা যখন একদিন খুব ভালো চাকরি পাওয়ার খবর দিল, তখন যে আনন্দ পেয়েছি, তার তুলনা নেই! এমন আনন্দের ঘটনা বহুবার এসেছে আমার জীবনে। এই আনন্দটুকুই আসলে চাই আমি। আমার বিশ্বাস, টাকা নিজের জন্য ব্যয় করে এই আনন্দটুকু পেতাম না কখনোই। বঙ্গবন্ধুর ডাকে রাজনীতিতেও নাম লিখিয়েছিলাম। ১৯৭০ সালে হোমনা-মুরাদনগর নির্বাচনী এলাকা থেকে এমএনএ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম রাজনীতি করলে হয়তো আরও ভালোভাবে সমাজসেবা করতে পারব। কিন্তু সেটা হয়নি। তাই রাজনীতি থেকে সরে এসেছি একসময়।’

এই বেশ ভালো আছি
এবার আবুল হাশেমের ঘুম সম্পর্কে একটা তথ্য শুনুন। এমনিতে মুখে মুখেই তিনি কোটি টাকার হিসাব করে ফেলেন। তবে সারা দিনের টাকা-পয়সার হিসাবটা রাতে ঘুমানোর আগে হিসাবের খাতায় তাঁর মেলানো চাই-ই চাই। নইলে? ঘুম সেই রাতে অধরাই থেকে যাবে। আবুল হাশেম বললেন, ‘হিসাব মিললে চমৎকার একটা ঘুম হয়। নইলেই ঝামেলা। তবে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটেছে জীবনে। আল্লাহর রহমতে স্মৃতি, দৃষ্টি কিংবা চলৎশক্তি—কোনোটাই এখনো আমার সঙ্গে প্রতারণা করেনি।’ এই বয়সেও এমন গুণপনা দেখে আবুল হাশেমের নাতি-পুতিরা বিস্ময় মানেন; বলেন, ‘নানাজান/দাদাজান, আমাদেরও এমনটা শেখান না!’
সুখের সংসার তাঁর। ১৯২২ সালের ১১ এপ্রিল কুমিল্লায় জন্ম। পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা। অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মা অজিফা খাতুন ও বাবা বদিউল আলমের ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ তিনি। বিয়ে করেছিলেন ১৯৫২ সালে, বুজিবা হোসেনকে। তিনি গত হয়েছেন ১৯৯৯ সালে। আবুল হাশেমের ১০ মেয়ে ও দুই ছেলের সবাই উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। আর তাঁর নাতি-পুতির দলটাও বিশাল। সবাই একসঙ্গে হলে চাঁদের হাট বসে যায় একটা। এই যেমন কয়েক দিন আগেও আবুল হাশেমের একুশে পদক পাওয়ার পর বসেছিল। একুশে পদকজয়ী এই সমাজসেবকের ভাষায়, ‘সব মিলিয়ে আমি সুখী। সুখী, কারণ আমি সব সময়ই চেয়েছি আমার আশপাশের সবাই সুখে থাকুক।’
—-সৌজন্যে…
শাহজাহান ইমরান ভূবনঘর

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs