সর্বশেষ সংবাদ :

যুদ্ধ থেকে যুদ্ধান্তরে আমার জনক বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমেদ

Share Button

রিপোর্টার:-দৈনিক মুক্তকন্ঠ,
১৯ ডিসেম্বর , ২০১৯। সময ০৮.০০. PM

★★যুদ্ধ থেকে যুদ্ধান্তরে আমার জনক★★

ডাঃ শামসুন নাহার (মিতা),১৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

আজ যাকে নিয়ে লিখতে বসেছি তাকে নিয়ে কিছু লেখার যোগ্যতা হয়তো আজও অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু জন্মসূত্রে এক অমোঘ অধিকার অর্জন করেছি তাকে নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার। সেই অধিকারবোধ থেকেই কলম ধরলাম।

লেখালেখিতে আমি তেমন পটু নই। কিন্তু সহজ সরল ভাষায় একজন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার আজীবন সংগ্রামের গল্পটি লেখার চেষ্টা তো করতে পারি। যদিও এক লেখায় তার হীরোকজ্জ্বল জীবনের গল্প তুলে ধরা অসম্ভব। যার কথা লিখবো আমি তার কন্যা। আমি একজন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আমার এই জীবনে এর চেয়ে গর্বের পরিচয় আর একটিও নেই।

বলছিলাম, আমার বাবার কথা। ১৯৫৪ সালে কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার নিলখি গ্রামে জন্ম নেন। তার পিতা মুন্সি মো. কালু মিয়া এবং মাতা অফুলা খাতুন। বাবা মা ভালবেসে নাম রাখেন আলী আহমেদ। মেধাবী ছাত্র, সদালাপী এবং পরোপকারী হিসেবে নিজ গ্রামে তো বটেই আশেপাশের গ্রামেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। বাবা ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন যার ফলে ১৯৬৮ সালে মাত্র নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের যোগ দেন। ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান এ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন। বয়স কম বলে মুক্তি পান। ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এ আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে কাজ করেন।

এলো ১৯৭১, শোষণের নাগপাশ ছিড়ে বাঙালির মুক্তি পাবার বছর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা দিয়ে সেদিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন কৃষক, শ্রমিক, জেলে-তাঁতিসহ সর্বস্তরের জনগণ। অপার সাহসী সেই মানুষের মিছিলে আমার বাবাও ছিলেন। বাবা চলে গেলেন ভারতে। ১৫ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত মেলাঘরে প্রশিক্ষণ নিয়ে ২ নং সেক্টরে যোগ দেন এবং ঝাঁপিয়ে পড়েন সম্মুখ সমরে। চরকুমারিয়া, ঘাঘুটিয়া, গজারিয়া, পঞ্চবটির যুদ্ধ, ঢাকা কুমিল্লা মহাসড়কে চেন্নই ব্রীজের উপর যুদ্ধসহ মোট ১৫টি সম্মুখ সমরে অংশ নেন।

১৯৭১ এর ৩১ অগাস্ট। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বাবা এবং তার সহযোদ্ধারা হোমনা থাকা আক্রমণ করেন। সারারাত চলে ভয়াবহ যুদ্ধ। লাগাতার গুলিবর্ষণ এবং সারারাত বিরতিহীন যুদ্ধের শেষে সবাই যখন ক্লান্ত বিদ্ধস্ত, তখন আমার সেই ক্লান্ত বাবার গায়ে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত বাবা ভর্তি হন হাসপাতালে। একমাস চিকিৎসায় বাবার শরীর সুস্থ হলেও তার বাম হাতের একটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়। কী ভাবছেন? নিজের অঙ্গহানী, রক্তক্ষরণ আর সহযোদ্ধাদের মৃত্যু দেখে ১৭ বছরের বাচ্চা ছেলে ভয় পেয়ে বাড়ি ফিরে গেল? না। বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা অকুতোভয়। আমার বাবা অক্টোবরে আবার স্বমহিমায় ফিরে আসেন যুদ্ধক্ষেত্রে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে থাকেন তার সহযোদ্ধাদের সাথে।

আমি আজ সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করতে চাই বাবার সহযোদ্ধাদের নাম। শহীদ মুনীর, শহীদ খোরশেদ, মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, এরশাদ হোসেনসহ অন্যদের নাম।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়। কিন্তু কিছু পাকিস্তানি সৈন্য আটকে ছিলেন হোমনাতে। দফায় দফায় যুদ্ধশেষে ২৩ ডিসেম্বর তারা আত্মসমর্পণ করেন। বাবার যুদ্ধটা আপাতত শেষ হয়। বাবা ফিরে আসেন তার মায়ের কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড সম্পন্ন করেন। ১৯৮৮ সালে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। দীর্ঘদিন চাকরির পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্নসচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ নেন। বর্তমানে তিনি আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন।

ফিরে যাই ৭১ এ। বলেছিলাম না যে বাবার যুদ্ধটা আপতত শেষ হলো? ২৩ ডিসেম্বর বাবা ফিরে এলেন এবং ফেরত দিলেন অস্ত্র। ইস্পাতের অস্ত্রটা ফেরত দিলেও বাবার ইস্পাত কঠিন মনোবল আর দেশপ্রেম কিন্তু তার নিজের কাছেই ছিল। সেই শক্তিকে সম্বল করেই বাবা ঝাঁপিয়ে পড়েন নতুন এক দেশ গড়ার যুদ্ধে, যা সৃষ্টিকর্তার অপার করুনায় তিনি আজও চালিয়ে যাচ্ছেন। আজীবন বাবাকে দেখেছি নিজের সাধ্যের মধ্যে থেকে এবং অবশ্যই অগণিতবার সাধ্যের বাইরে যেয়ে মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। বাবা বলেন- আমরা যেই দেশের স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধে গেছি সেই দেশের দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। আমি যতোটুকু পারি করেই যাবো।

বাবা যখন স্কুলে যেতেন তাকে পাড়ি দিতে হতো গ্রামের পর গ্রাম। সময়ের পট পরিবর্তনে ছেলেরা কিছুটা দূরের স্কুলে যাওয়া শুরু করলেও নিরাপত্তার অভাবে মেয়েরা স্কুলে তেমন একটা যেতে পারতোনা। বাবা গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাবা ছিলেন সেই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। ১৯৯৪ সালে বাবা প্রতিষ্ঠা করেন নীলখী উচ্চ বিদ্যালয়। আমি দেখেছি প্রতিমাসে বাবার সীমতি বেতনের টাকা থেকে প্রতিটা বোনাসের টাকা থেকে এবং নিজেদের জমি বিক্রির টাকা থেকে বাবা এবং মা স্কুলের শিক্ষকদের বেতন এবং আনুষঙ্গিক খরচ যগিয়েছেন। তাই আমরা কোনোদিন বিলাসিতা করতে পারিনি। আর আমরা ভাই বোনেরাও বুঝে গিয়েছিলাম এবং ভালোবেসে গ্রহণ করেছিলাম এই সত্যটা যে আমাদের পিতা শুধু আমাদের জন্য নয় তিনি সার্বজনীন।

বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি এখন পর্যন্ত আমাদের গ্রামের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয় এবং সরকারি তালিকাভুক্ত। আমাদের গ্রামে এখন শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ। শুধু অল্পবয়সীরাই নয়। অনেক মধ্যবয়স্ক মানুষ ও স্কুলে ভর্তি হয়ে এসএসসি পাশ করেছেন। আমার বাবার শ্রমে ঘামে বানানো স্কুল ভবনের সামনে দাঁড়ালে বুকটা গর্বে ভরে উঠে। এক জীবনে সুখী হতে এর চেয়ে বেশি আর কী লাগে বলুন?

আমাদের গ্রামের যে কোনও রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট বিনির্মানে, বিদ্যুৎ সংযোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে শত ব্যস্ততার মাঝেও বাবাকে দেখেছি ছুটে যেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে। বাবাকে দেখেছি নিপুণ বুদ্ধিতে সমাধান দিচ্ছেন মানুষের বিপদে। দেখেছি ভয়াবহ বিপদের দিনেও আকুণ্ঠ চিত্তে শত মানুষকে সাহস জোগাতে। আমাদের বরাদ্দ সময়ের অনেকটাই বাবা দিতেন গ্রামবাসীকে। রোজ কেউ না কেউ আসতেন বাসায়। বাবা ভালোবেসে তাদের কথা শনতেন। তাদের সাহায্য করতেন। বাবা প্রতিষ্ঠা করছেন ‘ইনসানিয়াত’ নামের একটি মানবতাবাদী সংগঠন, যেখানে থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে বিনামূল্যে আইনি এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

আমার বাবার কর্মময় জীবনে আমার দাদা-দাদী এবং আমার মা অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে সমর্থন করে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চার সন্তানের জনক এবং চার সন্তানই সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত।

বাবাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তুমি তো জানতে যে মারা যেতে পারো। মাত্র ১৭ বছর বয়সে এতো সাহস কীভাবে পেলে? বাবা বলেছিলেন, “মা রে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডাক দিলেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম তখন ঘরে বসে থাকতে পারিনি। দেশের স্বাধীনতা অর্জনই ছিল লক্ষ্য।

বাবাকে আরো বললাম- বাবা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কাছে তোমার চাওয়া কী?

বাবা বললেন একটি অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্য মুক্ত, মাদকমুক্ত এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই।

আমি জানি এই স্বপ্নটা কেবল আমার বাবার নয়, এই স্বপ্নটা জীবিত এবং মৃত সকল মুক্তিযোদ্ধার।

আমার বাবা তার জীবনে প্রমাণ করেছেন, দেশের জন্য যুদ্ধটা আজীবনই করে যেতে হয়, যে যেখানে আছে সেখান থেকেই, যার যতোটুকু সামর্থ্য ততোটুকু দিয়েই। বাবা বলেন, “দেশের জন্য যুদ্ধে কোনো বিরামচিহ্ন দিতে নেই। কখনো বিশ্রাম নিতে নেই।”

১৯৭১ এ যুদ্ধ করে আমার বাবা আমাকে একটি পতাকা এনে দিয়েছেন। আমার সবুজ সেই পাতাকার মাঝখানে টকটকে রক্তলাল যেই বৃত্তটা সেখানে আমার বাবারও এক ফোটা রক্ত আছে। আমার বাবা আমার বিস্ময়! আমার বাবা আমার বাংলাদেশ।

ডাঃ শামসুন নাহার (মিতা), যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs