সর্বশেষ সংবাদ :

কুমিল্লায় সাক্কু-ইয়াছিন ঐক্যে উজ্জীবিত কর্মীরা

Share Button
Yasin-Sakku
রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ২৭ নভেম্বর ২০১৪।
রাজনৈতিকভাবে (দক্ষিণ ও উত্তর) বিভক্ত কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপিতে দীর্ঘ ২৮ বছর চলা কোন্দলের অবসান হয়েছে। দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিনুর রশিদ ইয়াছিন ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর মধ্যে ঐক্য হওয়ায় নেতাকর্মীরাও বেশ উজ্জীবিত। শুধু দক্ষিণ নয়, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির রাজনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাংগঠনিকভাবে দল সুসংগঠিত হবে, যা সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, একসময়ে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছিল বিএনপির ঘাঁটি। কিন্তু মহানগরের দুই প্রভাবশালী নেতার মধ্যে দীর্ঘদিন চলে আসা দ্বিধা-বিভক্তির কারণে দলকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৮৭ সাল থেকে সাবেক মন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন বীর প্রতীক ও দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক এমপি রাবেয়া চৌধুরীর মধ্যে কোন্দল থাকলেও ২০০৭ সাল পর্যন্ত এ কোন্দলের প্রভাবে তেমন কোনো মাশুল দিতে হয়নি। আকবর হোসেনের মৃত্যুর পর থেকে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি হাজী আমিন-উর রশিদ ইয়াছিন ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর মধ্যে চলমান কোন্দলে বিএনপির অবস্থা ছিল শোচনীয়। এই গ্র“পিং ইয়াছিন-সাক্কুর মধ্যে চলমান থাকে। আগামী ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কুমিল্লা সমাবেশকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে আড়াই যুগের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৭ সালে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির লে. কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন ও রাবেয়া চৌধুরীর গ্র“পিংয়ের মধ্য দিয়ে প্রথম কোন্দলের সূত্রপাত হয়। ১৯৮৪ সালে বেগম রাবেয়া চৌধুরী প্রথম কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি হন। তিনি ১৬ বছর সভাপতি পদে ছিলেন। ১৯৮৭ সালে সাবেক মন্ত্রী আকবর হোসেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপিতে প্রবেশ করার পর থেকে রাবেয়া চৌধুরীর সঙ্গে কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৮ সালে আকবর হোসেনকে সভাপতি ও কামাল উদ্দিন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটি করা হয়। ওই সময় রাবেয়া চৌধুরীকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল এবং দলীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোও বন্ধ করা হয়। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া কুমিল্লা টাউন হলের এক জনসভায় রাবেয়া চৌধুরীকে প্রবেশ করতে বাধা দেয়া হয়। ২০০৪ সালে পুনরায় আকবর হোসেন সভাপতি ও জাহাঙ্গীর আহমেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে আকবর হোসেনের মৃত্যুর পর কৌশলে আকবর গ্রুপ রাবেয়া চৌধুরীকে দূরে রেখে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় মরহুম অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তারকে। ২০০৭ সালে অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তারের মৃত্যুর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আকবর গ্র“পের প্রধান বর্তমান সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু আত্মগোপনে চলে গেলে মাঠে আসেন রাবেয়া চৌধুরী ও হাজী ইয়াছিন। ২০০৯ সালের ২৪ নভেম্বর দক্ষিণ জেলা বিএনপির সম্মেলনে রাবেয়া চৌধুরীকে সভাপতি ও হাজী ইয়াছিনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এতে মনিরুল হক সাক্কু সাধারণ সম্পাদক হওয়া নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। ওই সম্মেলনস্থলে যেতে না দেয়া এবং পরে ১৫১ সদস্যের কমিটিতে সাক্কু গ্রুপের নেতাকর্মীদের কাক্সিক্ষত পদ-পদবি না দিয়ে বঞ্চিত করায় কোন্দল আরও প্রকট হয়। এ কারণে সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০১০ সালে দক্ষিণ জেলা যুবদলের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই গ্র“পের নেতাকর্মীরা সম্মেলনস্থলে ব্যাপক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের ওপর হামলার ঘটনায় সাক্কু গ্রুপ ইয়াছিন গ্রুপের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ২০১১ সালে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইয়াছিন গ্রুপ সাক্কুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি জেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে খালেদা জিয়ার জনসভায় সাক্কু-ইয়াছিনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরবর্তী সময়ে জেলা পর্যায়ের বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের জেলা কমিটি গঠন, ওয়ার্ড-ইউনিয়ন ও পৌর এবং সম্মেলন ঘিরে চরম বিশৃংখলা দেখা দেয়। তাদের দুজনের মধ্যে চলমান কোন্দলে সাংগঠনিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে দক্ষিণের রাজনীতি। কেন্দ্র থেকে ঘোষিত কর্মসূচিও দুই গ্রুপ আলাদাভাবে পালন করে আসছিল। তাদের কোন্দলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলন। সারা দেশে জেলা পর্যায়ে সর্বাত্মক কর্মসূচি পালিত হলেও কুমিল্লায় ছিল ভিন্ন চিত্র। দুই গ্রুপের হাতেগোনা কিছু নেতাকর্মীকে রাজপথে দেখা যেত। সরকারবিরোধী আন্দোলনের চেয়ে নিজেদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন।
দলীয় ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিব্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কুমিল্লা সফরকে কেন্দ্র করে গত ১১ নভেম্বর দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি রাবেয়া চৌধুরীর বাসভবনে সমঝোতা বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে ইয়াসিন ও সাক্কু তাদের অনুসারীদের নিয়ে উপস্থিত হন। ওইদিন সন্ধ্যায় জেলা বিএনপির কার্যালয়ে দলের বৈঠকে ইয়াছিন ও সাক্কু ঘোষণা দেন, সব ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একত্র হয়ে দলের জন্য কাজ করতে হবে। এ ঘোষণায় নেতাকর্মীদের মাঝে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পর জেলা বিএনপির দুই নেতা ইয়াছিন ও সাক্কুর মধ্যে চলে আসা বৈরী সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে অবসান হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন দলের সিনিয়র নেতারাও।
জেলা বিএনপির সভাপতি বেগম রাবেয়া চৌধুরী বলেন, এ জেলায় দলে কোনো দ্বিধা-বিভক্তি নেই, সবাই ঐক্যবদ্ধ। দু-এক উপজেলায় থাকলেও তা মান-অভিমান, যা মিটে যাবে। কুমিল্লা বিএনপির আলোচিত দুই নেতা হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন ও মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। তাই আর কোনো বিভেদ নয়। ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন বেগবান করতে হবে।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs