সর্বশেষ সংবাদ :

বেগম জিয়ার সাম্প্রতিক জনসমাবেশ ও নাগরিক ভাবনা। সম্পাদকীয়

Share Button
45734_480876018639497_1811827755_n
মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম ঢাকা, ২১ নভেম্বর ২০১৪।
অনেকে বলছেন বিএনপি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। আন্দোলন করার মুরোদ নাই। জনগণ বিএনপিকে ছেড়ে সরকারের কর্মকা- দেখে খুশী। ফলে জনগণ আর আন্দোলন-সংগ্রাম চায় না। জনসম্পৃক্ততা হারিয়ে বিএনপি আর দৃশ্যমান কোন কঠোর কর্মসূচি নিতে পারবে না। বারবার আলটিমেটাম দিয়ে বেগম জিয়া পিছু হটছেন। মামলা-হামলা অত্যাচার, নির্যাতনে নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে গেছে। আর কোন আন্দোলন গড়ে উঠতে পারবে না। আ.লীগ এভাবে অত্যাচার-নির্যাতন ও মামলা-হামলা চালিয়ে পাঁচ বছর কাটিয়ে দিবে। আ.লীগের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়েছে। তারা আর কিছুতেই বিএনপি তথা বিশদলীয় জোটকে আন্দোলনের সুযোগ দেবে না। বিএনপি নেত্রী যতই আন্দোলনের আলটিমেটাম দিক না কেন কিছুতেই কিছু হবে না। বড় কথা হলো জনসমর্থনহীন অবস্থায় পড়ে তারা আর কিছুতেই মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। আন্দোলন-সংগ্রাম হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। ২০১৯ সালের আগে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না। অর্থাৎ সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও নীতি নির্ধারকদের অনেকের আস্ফালন ও আত্মম্ভরীতা বেড়ে গেছে। বিএনপি নেত্রী সম্পদ বিধ্বংসী ও জ্বালাও-পোড়াও জাতীয় কর্মসূচি না দেয়ায় সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা কিছুটা অখুশী। তারা বিরোধীদলের জ্বালাও-পোড়াও ও সহিংস কর্মসূচি ফলাও করে প্রচার করে দেশবাসীর সাথে বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করার সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছে। বিরোধীদলের আন্দোলনের সাথে কিছু সাবোট্যাজ হলে সে সবের দায় বিএনপি ও নেতাকর্মীদের উপর চাপিয়ে হাজার হাজার মামলা ও লক্ষ লক্ষ নামে-বেনামে আসামি করার সুযোগ নিতে সরকার যেন মুখিয়ে আছে। সে কারণে সম্ভবত সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা বিএনপি শেষ হয়ে গেছে। বিএনপির কোমড় ভেঙ্গে গেছে, বিএনপি আন্দোলন করতে জানে না ইত্যাদি বলে যাচ্ছেন।
আমাদের কথা হলো বিএনপি শেষ হয়ে গেলে, আন্দোলন করতে না পারলেত সরকার লাভবান হচ্ছে। সরকার নির্বিঘেœ নিশ্চিন্তে দেশ শাসন করতে পারছে। যা ইচ্ছা তাই করতে পারছে। জনস্বার্থ পরিপন্থী কাজ বা আইন পাস করতে পারছে। সংসদে যেহেতু কার্যকর কোন বিরোধীদল নেই সেহেতু সরকার নিজেদের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে আইন-বিধি ইচ্ছেমতো পাস করাতে পারছে। সারা দেশ প্রতিবাদ ও অনুরোধ করলেও সরকার সে বিষয়ে কর্ণপাত করছে না। অতি সম্প্রতি ষোড়শ সংশোধনী পাস বিষয়ে দেশের জ্ঞানী-গুণী, সুশীল সমাজ, আইনজ্ঞরা, রাজনৈতিক দলগুলো এমনকি সংবিধান প্রণেতা বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন পর্যন্ত অনুরোধ ও আহ্বান জানানোর পরও কাজ হয়নি। অনেকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিষয়ে আদালতের আদেশে প্রধানমন্ত্রী অখুশী হয়ে সংবিধান সংশোধন করেছেন। সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ সরকারের উপর ও ৭০ ধারা সংসদের উপর প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণ কর্তৃত্ব দিয়েছে। ষোড়শ সংশোধনী বিচার বিভাগের উপর কর্তৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সর্ব ক্ষমতাবান করেছে। বিচারপতিদের চাপে রাখতে ষোড়শ সংশোধনী এনে বিচার বিভাগকে বসে রাখার কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।
৫ জানুয়ারির প্রার্থীবিহীন ভোটারবিহীন তামাশায় নির্বাচনের পর সরকার বিদেশী বন্ধুদের স্বীকৃতি পাচ্ছে না। দেশের মানুষ নির্বাচন বর্জন করে আগেই জানিয়ে দিয়েছে তারা আ.লীগের সাথে নাই। নির্বাচনটি একদলীয় ও অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় মানুষ খুবই অখুশী। তারা সরকারের কর্মকা-কে স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী ভাবছে। বিদেশী বন্ধুরাও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে দ্রুত একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে চাপ অব্যাহত রেখেছে। সরকার স্বস্তিতে নেই-একথা জোর দিয়ে বলা যায়। তারা জানে, জনগণ তাদের সাথে নেই। দেশের সিংহভাগ মানুষ বেগম জিয়ার সাথে রেয়েছে। যার জ্বলন্ত প্রামাণ হলো বেগম জিয়ার জনসভাগুলোতে মানুষের ঢল।
সম্প্রতি নীলফামারী, নাটোর ও কিশোরগঞ্জে বেগম জিয়া জনসভা করেছেন। প্রতিটি সভাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সভাস্থানে যাবার পথে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ও বেগম জিয়াকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা বিএনপি তথা বিশদলের প্রতি মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা ও সমর্থনের ইঙ্গিতবহ। তিনি প্রতিটি জনসভাতে সরকারের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী কর্মকা-ের কঠোর সমালোচনার সাথে দেশের ভবিষ্যতে নিরপেক্ষ প্রশাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আ.লীগের দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র তুলে ধরেন। আ.লীগের লোকজনের জ্যামিতিক হারে সম্পদ বৃদ্ধির বর্ণনা দেন। র‌্যাব-পুলিশ জনগণের সেবা করার বদলে মানুষ হত্যা, গুম, হাইজ্যাকের সাথে জড়িয়ে পড়েছে।
তারা এখন কনট্রাক্ট কিলিং-এ ব্যস্ত। দেশে মানবাধিকার চরমভাবে বিঘিœত। তিনি আবারও র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ও সংসদ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত না হওয়ায় অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য। তারা জোরপূর্বক ক্ষমতা আঁকড়ে আছে। তিনি লুটপাটের বর্ণনা দেন। শেয়ার বাজার, হলমার্ক, ডেসটিনি, বিছমিল্লা গ্রুপ, বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ কোটি টাকা কেলেংকারীর বর্ণনা করেন। ব্যাংকগুলো ফোকলা হয়েছে, বিনিয়োগ নেই, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। দেশে কর্মসংস্থান বাড়ছে না, বিদেশী শ্রমবাজার সংকুচিত সবকিছুতে ভাটার টান। মধ্যপ্রাচ্য প্রতিবছর লাখ লাখ শ্রমিক নিচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধ করেছে। প্রধানমন্ত্রী অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করলেন। তাতে কোন লাভ হয়নি। জনশক্তি রফতানি-ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।
আসল কথা হলো, বহিঃবিশ্ব ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে মেনে নেয়নি। তারা জনগণের দুঃখকষ্ট বিবেচনা করে এই অবৈধ সরকারের সাথে কাজ করছে ঠিকই তবে মাঝে মধ্যে অবাধ নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে। জাতিসংঘ, ইইউ, গ্রেট ব্রিটেন, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র থেকে বারবার চাপ ও আহ্বান জানানো হচ্ছে। সরকার যতই বিশ্বের স্বীকৃতির কথা বলুক না কেন আসলে তারা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে সরকারকে চাপের মধ্যে রেখেছে। সরকার চাপমুক্ত হবার জন্য পথ খুঁজছে। মাঝে মধ্যে ২০১৯ সালের আগে কোন নির্বাচন নয়, বিএনপি আন্দোলন করতে জানে না ইত্যাদি কথা উচ্চারণ করে সান্ত¦না খুঁজছে। বিএনপি অত্যন্ত ধীরে-সুস্থে ও বিবেচনা করে মানুষের দুঃখ-কষ্ট বিবেচনায় নিয়ে আন্দোলন করছে। বেগম জিয়া অত্যন্ত বিজ্ঞতার সাথে আন্দোলন পরিচালনা করছেন। রাজনৈতিক কর্মকা-কে সন্ত্রাসী কর্মকা- থেকে আলাদা রাখার প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকার সামাজিক চক্রকে রাজনৈতিক চক্র হিসেবে রং দিতে সচেষ্ট। সবকিছু মাথায় রেখে এবার বেগম জিয়া এগুচ্ছেন। তারা আন্দোলনের মধ্যে আছেন-মহাসচিবের বক্তব্যটি খুবই সত্য। হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে বেগম জিয়া সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করছেন। দমবার পাত্র তিনি নন। সামরিক শাসক এরশাদকে হটাতে তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে কোনরকম আপস ও সমঝোতা না করে ৯ বছর রাজপথে থেকেছেন। সেসময় আ.লীগ ও জামায়াত ’৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে স্বৈরাচারী শাসনকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ করে দিয়েছিল। বেগম জিয়া আপস বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী নন বলে কখনও অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। বিশ্ব বিবেক মহান দার্শনিক সক্রেটিস একটু আপস করলে মৃত্যুদ-ের হাত থেকে রেহাই পেতেন। কিন্তু তিনি সত্যের বদলে অসত্যের সাথে আপস না করে মৃত্যুকে বেছে নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে আছেন। সত্যের জয় হয়েছে। বেগম জিয়াও সত্য প্রতিষ্ঠায় যেভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন তিনি বিজয়ী হবেন বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমার দুঃখ হয় যখন শুনি জামায়াত একটি অপাংতেয় ও দূষিত রাজনৈতিক দল। এর সংস্পর্শে আসলে দূষিত হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, “বিএনপি রাজাকারের দল। জামায়াতের সঙ্গে থাকায় তারা রাজাকার। জামায়াতকে ছেড়ে আসলে বিএনপিকে রাজনীতি করতে দেয়া হবে ইত্যাদি।’ আমাদের কথা হলো জামায়াতের সাথে থাকলে রাজাকার হতে হলে আ.লীগ অনেক আগেই সেই বদনামের ভাগীদার হয়েছে। ’৮৬ সালে এরশাদকে বৈধতা দিতে জামায়াত-আ.লীগ একসাথে নির্বাচনে অংশ নেয়। ১৯৯৪-৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছে। সে সময় জামায়াত বিশুদ্ধ ও পবিত্র ছিল? জামায়াতের সাথে বিএনপির রাজনৈতিক সখ্য, যুদ্ধাপরাধীর বিচার নস্যাত করার সখ্য। রাজনৈতিক জোট গণতন্ত্রে হতেই পারে। শহীদ নূর হোসেনের হত্যকারী ও ডা. মিলনসহ অনেকের রক্তের দাগ এরশাদের হাতে লেগে আছে। সেই এরশাদকে ক্ষমতার সিঁড়ি করে আ.লীগ রাজনীতি করছে। সেটি যদি দোষের না হয় তবে জামায়াতের সাথে বিএনপির থাকাতেও কোন দোষ দেখি না। স্বাধীনরাষ্ট্রে রাজনীতি করতে কারও অনুমতি দরকার নেই। যোগ্য নেতা, সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন থাকলে যে কোন দল রাজনীতি করতে পারে। জোর জবরদস্তি করে কোন সংগঠনকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা অসম্ভব।
বিএনপি শক্ত জনভিত্তি সম্পন্ন বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী-সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ী পরিবেষ্টিত এ দলের জনপ্রিয়তা বর্তমানে তুঙ্গে। সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন ও দুঃশাসনে নেতাকর্মীরা অতীষ্ঠ হলেও একজনও বেগম জিয়াকে ছেড়ে যাননি। বরং তারা আন্দোলন সংগ্রামের কঠোর কর্মসূচির জন্য নেত্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন। ১৫ তারিখে উত্তরা কমিউনিটি সেন্টারে রাজশাহী জেলার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের প্রতিনিধি সম্মেলন হলো। লে. কর্নেল (অব.) মাহবুবুর রহমান প্রধান অতিথি ছিলেন। কমিউনিটি  সেন্টারে উপচেপড়া ভিড় ছিল। সম্মেলন হলের বাইরেও শত শত কর্মী-সমর্থক দেখে অভিভূত হয়েছি, তারা বেগম জিয়ার হাত শক্তিশালী করতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। দৃঢ় কঠিন শপথ নিয়ে নেতাকর্মীরা আন্দোলন সংগ্রামে শরীক হতে দৃঢ় সংকল্প। তাদের আবেগময়ী বক্তব্য ও দৃঢ় সংকল্প দেখে আমার প্রতীতি হয়েছে, বেগম জিয়ার চূড়ান্ত ডাক বৃথা যাবে না। দেশের আনাচে-কানাচে বিএনপি তথা বিশদলীয় জোটের নেতাকর্মীরা বেগম জিয়ার ডাকের অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি চান। গণতন্ত্র মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শামিল হবার জন্য সকলে উন্মুখ হয়ে আছেন। তার দৃশ্যমান প্রমাণ হলো নীলফামারী, নাটোর ও কিশোরগঞ্জের জনসভায় লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিতি।
আমি পূর্বেই বলেছি বেগম জিয়া অত্যন্ত ধীরে মেপে মেপে পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তিনি জানেন সরকারের অগণতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু আচরণ দেশবাসীকে তার সাথে সম্পৃক্ত করতে সাহায্য করছে। তাছাড়া একদলীয় প্রহসনের নির্বাচনের ফলে বিদেশীদের সমর্থন হারানো সরকার দাবি মানতে বাধ্য হবে। প্রধান বিরোধীদলবিহীন নির্বাচনকে কেউ গ্রাহ্য করেনি। সরকার গণতান্ত্রিক স্পেস ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে ফেলছে। মিটিং মিছিল করতে নানাভাবে বাধা দিয়ে বিএনপিকে ঘরে আটকে রাখতে চাচ্ছে। ঢাকায় মিটিং মিছিল দূরের কথা ঘরোয়া মিটিং পর্যন্ত করতে দেওয়া হয় না। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সভা করতে দেওয়া হয়নি। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সভা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এসব অগণতান্ত্রিক কর্মকা- করে সরকার বিএনপির অগ্রযাত্রা থামাতে চায়। তবে বিশ্বায়নের এ যুগে সরকারের কোন কর্মকা-ই লুকিয়ে থাকছে না। সর্বকিছু মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে প্রচারিত হচ্ছে। বিএনপির প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন এতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আ.লীগ প্রায় প্রতিদিন ঢাকার সভা সমাবেশ করছে। তাদের ক্ষেত্রে পারমিশনের দরকার পড়ছে না। বিএনপি শর্তসাপেক্ষে সমাবেশ বা সভা করতে চাইলেও নিরাপত্তার অজুহাতে বাধা দেয়া হচ্ছে। ১৫ তারিখে আ.লীগ আওয়ামী যুবলীগের ৪২ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করেছে। ওই সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  বলেছেন, “২০ দলীয় জোট বাংলাদেশের জন্য বিষ ফোঁড়ার মতো। কোন ষড়যন্ত্র গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারেনি ভবিষ্যতেও পারবে না। বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে ইত্যাদি।’ কথা হলো, কে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে। একটি সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিকে আদালতের দোহাই দিয়ে ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাতিল করা হয়। এ সম্পর্কে অনেক লেখালেখি হয়েছে। তখনকার বিরোধীদলীয় জোটনেত্রী বেগম জিয়া প্রথম থেকে বিধানটি পুনঃপ্রবর্তনের দাবি জানাতে থাকেন। অনেক ছোট-বড় রাজনৈতিক দল বেগম জিয়ার দাবিকে সমর্থন করে। বেগম জিয়া জোরালোভাবে দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। জাতিসংঘ মহাসচিব উদ্যোগী হন। তার পক্ষে সহকারী সচিব ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশে দুবার আসেন। জাতিসংঘ একটি গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু সমাধানের লক্ষ্যে উভয় পক্ষকে রাজী করার চেষ্টা করেন। সরকারি তরফের চাতুর্যপূর্ণ ও কৌশলী মনোভাবের কারণে আলোচনা ভেস্তে যায়। মি. তারানাকো দ্বিতীয়বার এক সপ্তাহ অবস্থান করে আলোচনা চালিয়ে যাবার আহ্বান জানিয়ে প্রস্থান করেন। আলোচনা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে আলোচনা থেমে যায়। আমাদের কথা হলো, দেশবিদেশের অনুরোধ ও আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমস্যার সমাধান না করে জিইয়ে রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করা হয়। সদিচ্ছা নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চাইলে অনেক আগেই সমাধান হতো। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হতে পারত। সমস্যা সমাধানের দাবিতে বেগম জিয়ার ডাকে তিনদিনের হরতাল কর্মসূচি চলাকালে প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনে সংকট সমাধানের কথা বলেন। দুই থেকে আড়াই বছর ধরে দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাড়া না পেয়ে তিনি হরতাল ডাকেন। বেগম জিয়া নিজে হরতাল ডেকে নিজেই ভঙ্গ করে হবুচন্দ্র রাজার মতো দুর্দশাগ্রস্থ হতে চাননি। তিনি হরতালের পর আলোচনায় বসতে রাজী ছিলেন। আবশ্যক ছিল অপর পক্ষের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার। আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনা শুরু করলে সমাধান খুবই সম্ভব ছিল। ৫ জানুয়ারি অনেক দূরে ছিল। কিন্তু আ.লীগের কৌশলী ও চাতুর্যপূর্ণ কর্মকা- ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সংকটকে টেনে নিয়ে গেছে বললে বোধ হয় বাড়িয়ে বলা হবে না।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী বিশদলীয় জোটকে বাংলাদেশের জন্য বিষ ফোঁড়ার মতো উল্লেখ করেছেন। বিষ ফোঁড়া খুব সুখকর বিষয় নয়, বরং খুবই কষ্টদায়ক। কষ্টদায়ক জিনিসকে যত দ্রুত সম্ভব নিরসন করতে হয়। আমাদের কথা হলো, বিশদলীয় জোটের দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও জনপ্রিয় দাবি। তাই বিষ ফোঁড়াকে অপারেশন করে অতি দ্রুত ভালো করুন। অর্থাৎ অবিলম্বে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে সংলাপ শুরু করুন। সংলাপে সমাধান অবশ্যই বেরিয়ে আসবে। পৃথিবীতে বড় বড় সংকটের সমাধান অস্ত্রের প্রয়োগে হয়নি, হয়েছে সংলাপের মাধ্যমে। একটি ভালো নির্বাচনে প্রমাণ হবে জনগণ বিএনপির সাথে রয়েছে, না সরকারের সাথে। বিএনপি গণতন্ত্র ধ্বংস করার দল নয় বরং গণতন্ত্রকে সুরক্ষা করা বিএনপির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বিএনপি নেত্রী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অকুতভয় সৈনিকের মতো লড়ে যাচ্ছেন। জনগণ তার সাথেই রয়েছে।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs