সর্বশেষ সংবাদ :

রায় কার্যকরে মন্ত্রী-এটর্নির প্রতিযোগিতা যে কারনে

Share Button

97594_1

রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ৮ নভেম্বর ২০১৪।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই কার্যকর করতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। যে কারণে বৃহস্পতিবারের মধ্যেই রায় কার্যকরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিলো।

সরকারের আনুকূল্য পেতেই তারা মূলত এই প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। আর তাই রায় কার্যকর করা নিয়ে আইন বহির্ভূতভাবে একেকজন একেক ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র মতে, কামারুজ্জামানের রায় কার্যকর করে এটর্নি জেনারেল চাচ্ছিলেন এর কৃতিত্বটা নিজে নিতে। অপরদিকে আইনমন্ত্রী চাচ্ছিলেন এ রায় কার্যকরের মাধ্যমে সরকারের একটু বেশি আনুকূল্য পেতে।

কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ দুই ব্যক্তির বক্তব্য আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাঙ্ঘর্ষিক হওয়ায় এটা নিয়ে এখন আইনবিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও সচেতন মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, কামারুজ্জামানের আপিলের রায় ঘোষণার পরপরই এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রায়ের শর্ট অর্ডার চেয়েছিলেন। কিন্তু তখন তিনি তা পাননি।

৩ নভেম্বর সকাল ৯টা সাত মিনিটে কামারুজ্জামানের আপিলের চূড়ান্ত রায় পড়া শুরু হয়। ২ মিনিট রায় পড়ে ৯ টা ৯ মিনিটে শেষ হয়। এরমধ্যে ৯ টা দশ মিনিটেই এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দাঁড়িয়ে রায়ের শর্ট আদেশের জন্য মৌখিক আবেদন করেন।

তার মৌখিক আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি এস কে সিনহা বলেছেন, এটা আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা হবে।

এরপর এটর্নি জেনারেল একাধিকবার বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের প্রয়োজন নেই এক্ষেত্রে শর্ট আদেশেই রায় কার্যকর করা যাবে।

রিভিউ পিটিশন নিয়েও এটর্নি জেনারেল সংবিধানের ৪৭’র ক ধারা দেখিয়ে বলেছেন রিভিউ চলবে না।

আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের সময়ও তিনি বলেছিলেন কোনো রিভিউ চলবে না। কিন্তু দেখা গেছে, কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ ১০ ডিসেম্বর রাতে সাময়িকভাবে স্থগিত করার পর ১১ ডিসেম্বর, ২০১৩ আসামী পক্ষ দু’টি রিভিউ পিটিশন করেছিল এবং শুনানিও হয়েছিল। ১২ ডিসেম্বর তাদের রিভিউ পিটিশন ডিসমিস হয়। তখন শর্ট আদেশে বলা হয়েছিল- ’Both the review petitions are dismissed’।

যেহেতু রিভিউ পিটিশনের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি তাই আজ পর্যন্ত জানা যায়নি কেন সেই রিভিউ পিটিশনটি ডিসমিস হয়েছিল।

আর কামারুজ্জামানের আপিলের রায়ের কোনো কপি এখনো প্রকাশি হয়নি।

এমতাবস্থায় রিভিউ চলবে না বলে এটর্নি জেনারেলের দেয়া বক্তব্যে মানুষের মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

তার এ বক্তব্যকে অনেকে বিচারপতিদের ওপর স্নায়ু চাপ সৃষ্টির চেষ্টা বলেও মন্তব্য করেছেন।

দেশের খ্যাতিমান আইনবিশেষজ্ঞ ব্যরিস্টার রফিক-উল হকও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। মৃত্যুদ- কার্যকর করতে সংক্ষিপ্ত হোক কিংবা পূর্ণাঙ্গ হোক রায়ের কপি আসামিকে দেখানো উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে নিজ চেম্বারে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘ফাঁসি হয়েছে- এটা আসামির জানতে হবে না? রায়ের কপি না পেলে আসামি ক্ষমা চাইবে কোন গ্রাউন্ডে। রায়ের কপি দেখেই আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবে।’ রায় কার্যকর হওয়ার আগে কপি পাওয়া আসামির অধিকার।

অপরদিকে দেখা যাচ্ছে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আইনবহির্ভুত শুধু ব্যাখ্যাই দেননি রায় কার্যকরের জন্য তিনি কারা কর্তৃপক্ষকে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশও দিয়েছেন।

তার বক্তব্যের পর এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বুধ অথবা বৃহস্পতিবার রাতেই কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হয়ে যাবে।

২০১৩ সালে আব্দুল কাদের মোল্লার রায়ের পর এডভোকেট আনিসুল হক বলেছিলেন, আব্দুল কাদের মোল্লার রিভিউ চলবে। কিন্তু সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পর অবস্থান পরিবর্তন করে তিনি এখন বলছেন, রিভিউ চলবে না।

তাই এখন অনেকেই আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রশ্ন তুলছেন, তিনি মন্ত্রী হওয়ার পর কী রিভিউর আইন পরিবর্তন হয়ে গেছে? যদি আইনের পরিবর্তন না হয়ে থাকে তাহলে তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করলেন কেন?

জেলকোড নিয়েও আইনমন্ত্রী বার বার তার অবস্থান পরিবর্তন করছেন। রায় ঘোষণার পর তিনি বলেছিলেন, কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রে জেলকোড প্রযোজ্য হবে। কিন্তু পরে আবার তিনি সাংবাদিকদের বললেন, তার ক্ষেত্রে জেলকোড প্রযোজ্য হবে না। জেলকোড নিয়ে আইনমন্ত্রীর দেয়া ব্যাখ্যাকেও অনেকে অদ্ভুত বলে মনে করছেন।

আইন বিশেষজ্ঞরা যেখানে বলছেন, রায়ের কপি দ-প্রাপ্ত ব্যক্তির হাতে পৌঁছানোর পর, অথচ সেক্ষেত্রে আইনমন্ত্রী বলছেন রায় শোনার পর থেকেই দিন গণনা শুরু হবে।

এদিকে কারা কর্তৃপক্ষকে রায় কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে আইনমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়েও এখন বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

নিয়ম অনুযায়ী, আপিল বিভাগের রায় প্রকাশের পর প্রথমে তা ট্রাইব্যুনালে যাবার কথা। এরপর ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যু পরোয়ানা জারি হবে। এ মৃত্যু পরোয়ানা আসামির হাতে যাবে।

পরোয়ানা আসামির হাতে পৌঁছানোর পর তিনি সাত দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন।

কিন্তু এতগুলো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের আগেই রায় কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে কারা কর্তৃপক্ষকে আইনমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়ে আইনবিদরা ক্ষুব্ধ। একইসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সচেতন মানুষ ছাড়াও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যেই প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই বলাবলি করছেন আইনমন্ত্রী আর এটর্নি জেনারেল সরকারের অধিক আনুকূল্য পাওয়ার প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে গোটা প্রক্রিয়াকেই এখন প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

সূত্র: শীর্ষ নিউজ

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs