সর্বশেষ সংবাদ :

কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

Share Button
images-1
রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ৮ নভেম্বর ২০১৪।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিদেশীরা। তারা বলছেন, এটি একটি অস্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া। একের পর এক মৃত্যুদন্ড দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কামারুজ্জামানকে সব ধরনের আইনি অধিকার প্রাপ্তির সুযোগ দেয়া উচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে সব ধরনের মৃত্যুদ-াদেশ স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা।
মুহাম্মদ কামারুজ্জানকে গত সোমবার একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ- কার্যকর করার নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা চার সদস্যের একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চের পক্ষে আসামির আবেদন আংশিক মঞ্জুর করে এ রায় দেন। এরপর কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের মধ্যে চলে আইনি বিতর্ক। আইনজীবীরা পরস্পর বিরোধীমত  প্রকাশ করে।  রাষ্ট্রপক্ষ বলে, সংক্ষিপ্ত আদেশে রায় কার্যকর করা যাবে। রিভিউ করার সুযোগ নেই। আসামিপক্ষ বলে, রিভিউ আবেদনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি সংযুক্ত করতে হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর কামারুজ্জামান রিভিউ করবে। দেশের সব নাগরিকেরই রিভিউয়ের সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে। রিভিউ সাংবিধানিক অধিকার।
কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- স্থগিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের দুই মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। গত বৃহস্পতিবার জেনেভা থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের সামারি এক্সিকিউশন বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোটিয়ার ক্রিস্টফ হেইন্স এবং বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোটিয়ার গ্যাব্রিয়েলা নাউল মৃত্যুদ-ের রায়কে মানবতাবিরোধী হিসেবে অভিহিত করেন।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ প্রাণদ- বাতিল করেনি সেসব দেশে ন্যায়বিচার এবং আইনি প্রক্রিয়া যথাযথ ও কঠোরভাবে অনুসরণের পরই কেবল এ জাতীয় দ- দেয়া যেতে পারে। এছাড়া, সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষমা প্রার্থনা বা দ- মওকুফের আবেদন করার অধিকারও থাকতে হবে। এর আগেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের স্বচ্ছতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসংঘের ওই বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়ার ওপর নিবিড় নজর রাখছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কার্যকর করা হয়নি এমন সব মৃত্যুদ- স্থগিত করতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা। গত বৃহস্পতিবার সংস্থার ঢাকা অফিস থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এমন আহ্বান জানিয়ে তারা বলেছে, মৃত্যুদ- বাতিল করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মৃত্যুদ-ের শাস্তি শিথিল করতে হবে। এর আগে গত বুধবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনেও এর বিরোধিতা করে রায় পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত সংস্থার নতুন রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াডুন। তবে ইইউ মানবতাবিরোধী বিচারের বিপক্ষে নয় বলেও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি। ওই বিবৃতিতে ইইউ জানায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষণে রেখেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন এসব অপরাধের সম্ভাব্য ফাঁসির দ- নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে ইইউ। এটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং অমানবিক। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুদ- বিলোপে ইইউ’র যে ভূমিকা রয়েছে তার বাস্তবায়ন দেখতে সংস্থার বাংলাদেশি কর্মকর্তারাও কাজ করছে উল্লেখ করে ওই বিজ্ঞপ্তিতে এ রায় রহিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের সমালোচনা করে ‘নো পিস উইদাউট জাস্টিস’ নামের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন গত বৃহস্পতিবার বিবৃতিতে বলে, এটি একটি অস্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া। একের পর এক মৃত্যুদ- দিয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নিউইয়র্ক, ব্যাসেলস এবং রোমভিত্তিক সংস্থাটি কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দেয়া মৃত্যুদ-ের বিষয়ে বলে, গত ৩ নভেম্বর প্রদত্ত রায়ে বাংলাদেশের আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- নিশ্চিত করেছে। সর্বশেষ এই রায়টি ট্রাইব্যুনালের আরো একটি বিতর্কিত রায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেননা ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে যারা সন্দেহ পোষণ করেন এবং নিয়মিতভাবেই উদ্বেগ জানান, সেই সব মহল এই রায়ে নতুন করে অবিচারের সন্ধান পাবেন। রিভিউ আবেদন জমা এবং প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা প্রার্থনাসহ কামারুজ্জামানের সব রকমের আইনি অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় সংস্থাটি। এ ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে তাকে সকল আইনি সুযোগ ও অধিকার প্রদান করা এবং মৃত্যুদ-াদেশ বাতিলের ব্যাপারে সরকারের চিন্তা করা উচিত বলে মন্তব্য করে সংস্থাটি। নো পিস উইদাউট জাস্টিস, নন ভায়োলেন্ট রেডিকাল পার্টি এবং ট্রান্সিশনাল এন্ড ট্রান্সপার্টি মনে করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া পূর্বের অন্যায় ও অপরাধের সুরাহা করার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের সুযোগ। তবে বর্তমানে এটি যেভাবে চলছে তাতে একে রাজনৈতিক নিপীড়ন চালানোর হাতিয়ার ছাড়া ভিন্ন কিছু ভাবার সুযোগ নেই বলেও জানানো হয়। কারণ হিসেবে মানবাধিকার তারা বলে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যেসব প্রশ্ন ও উদে¦গ বিচারের ক্ষেত্রে তোলা হয়েছে, তার কোনো সমাধান দিতে ট্রাইব্যুনালের মতো আপিল বিভাগও ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া আইসিটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন চালানোর জন্য ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় নো পিস উইদাউট জাস্টিস, নন ভায়োলেন্ট রেডিকাল পার্টি এবং ট্রান্সিশনাল এন্ড ট্রান্সপার্টি। আর একই সঙ্গে তদন্ত কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ট্রাইব্যুনালের যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য আহ্বান জানায় তারা।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মানবাধিকার সংক্রান্ত কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডস-এর সদস্য লর্ড এভিবুরি কামারুজ্জামানের ফাঁসি বাতিল করে তার আইনি অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। গত বুধবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অতি সম্প্রতি জামায়াতের আমিরসহ দুইজনকে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে। অন্যদিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মাদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে একই ট্রাইব্যুনাল থেকে পূর্বে দেয়া মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রেখেছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত। কামারুজ্জামান একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং ইতোপূর্বে এফসিও কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে তিনি বেশ কয়েকবার যুক্তরাজ্য ভ্রমণ করেছেন। বিবৃতিতে লর্ড এভিবুরি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশের এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে আমরা মনে করি, যে কোন চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে নিম্নোক্ত আইনি পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি। তাহলো- সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিদের অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে জানাতে হবে যে কি কি কারণে তারা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দেয়া ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রাখলেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর তা অভিযুক্তকে দিতে হবে এবং সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এরপর থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তাকে সেই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে। তারপর পরবর্তী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে অভিযুক্তকে প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার সুযোগও দিতে হবে।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs