সর্বশেষ সংবাদ :

কুমিল্লায় বিদ্যুৎ বিভাগে অরাজকতা বিল পেয়েই আঁতকে উঠছেন গ্রাহক

Share Button

Image result for কুমিল্লায় বিদ্যুৎ বিভাগে অরাজকতা বিল পেয়েই আঁতকে উঠছেন গ্রাহক

রিপোর্ট:-দৈনিক মুক্তকন্ঠ,
০৩ আগস্ট ২০১৭। সময়: ০৬.২০.PM

ফেব্রুয়ারিতে বিল ৮ হাজার ৮২০, মার্চে ১২ হাজার ৫৮০, এপ্রিলে ২৩ হাজার ৫৬, মে মাসে ১১ হাজার ১৬৫ টাকা বিল এসেছে কুমিল্লা শহরের রাণীর দিঘির পাড়ের প্যারাডাইস ¯েœহনীড় ভবনে। কিন্তু জুন মাসে এ বিল আট গুন বেড়ে এসেছে ৮৬ হাজার ৭৮৯ টাকা। বিল দেখে মাথায় বজ্রপাত হওয়ার মতো অবস্থা ঐ ভবনের ফ্যাট মালিক এসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের। অতিরিক্ত ৭৫ হাজার টাকা কোথা থেকে তারা সংস্থান করবেন বুঝতে পারছেন না। এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. তোফায়েল আহমেদ উপায়ন্তর না দেখে কুমিল্লা বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডে বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে আবেদন করেছেন পুনরায় তদন্ত করে বিল দেয়ার জন্য। কিন্তু বিদ্যুত অফিস থেকে বলা হয়েছে বিলটি পরিশোধ করতেই হবে। পরের মাসে যাতে কম আসে সেটি তারা দেখবেন।
কুমিল্লার কুচাইতলীর কাজী আলী মনসুর লিটনের জানুয়ারি মাসের পর থেকে বিল বাড়তে বাড়তে ২ হাজার টাকা থেকে সাড়ে আঠারো হাজার টাকায় পৌঁচেছে। জানুয়ারি মাসে তার বিল ছিল ২ হাজার ২০ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৯৮০ টাকা, মার্চে ৪ হাজার ৯৬০ টাকা, এপ্রিলে তা একলাফে ১৪ হাজার ৭৬০ টাকা এবং মে মাসে ১৮ হাজার ৫৮৫টাকায় দাঁড়ায়।
কুমিল্লা শহরের কাপ্তান বাজারের এনামুল হকের অবস্থা আরো শোচনীয়। তিন বছর ধরে মাসে গড়ে ৭৪ টাকা যেখানে বিল হতো তার সেখানে এপ্রিল মাসে বিল হয়েছে ৩১ হাজার ৫১১ টাকা, জুন মাসে ৪৯ হাজার ১৩৯ টাকা বিল হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩ এর আওতাধীন কুমিল্লার পদুয়ার বাজারের আবদুর রশিদের মে মাসে হঠাৎ করে বিল এসেছে ৪৪ হাজার ২৮৭ টাকা আর জুন মাসে তা কমে বিল এসেছে ১৭ হাজার ৭৬৫ টাকা। বিলের এই ভূতুরে অবস্থার কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি।
কুমিল্লা বিদ্যুৎ বিভাগের এই রকম অসংখ্য ভুতুরে বিলে বিপাকে পড়েছেন কুমিল্লার বিদ্যুত গ্রাহকরা। ‘জুন মাসের টার্গেট’ অনুযায়ি ‘কালেকশন’ বেশি দেখাতে গিয়ে গ্রাহকদের মনগড়া ও দ্বিগুন থেকে দশ গুনের বেশি বিল পাঠাচ্ছেন বিদ্যুত বিভাগ। অভিযোগ রয়েছে মিটার রিডাররা বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানায় না গিয়ে নিজের মনের মতো রিডিং লিখে বিল করেন। তাদের করা বিল গ্রাহকের কাছে পৌঁছলে গ্রাহকরা আতঁকে উঠেন। বিল পরিশোধের শেষ তারিখ চলে গেলে অনেকের কাছে বিল পাঠানো হয়। পাঠানো বিলের সাথে মিটারের রিডিংয়ের কোন মিল নেই। গড়ে ৩ শ’ বা ৪ শ’ ইউনিট ব্যবহার করেছে উল্লেখ করেও বিল পাঠানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে রিডিং অনুযায়ি গ্রাহকরাই বিদ্যুত বিভাগের কাছে উল্টো টাকা পাওনা থাকেন। তাছাড়া বিদ্যুত বিভাগে চরম দুর্নীতির কারণেও অনেক গ্রাহককে হয়রানী হতে হয়।
বিদ্যুত বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ ৩ এর অধীন কুমিল্লার চৌয়ারার সেকান্দর আলীর নামে থাকা একটি মিটারের বিদ্যুৎ সংযোগ পূর্বের সকল বিল পরিশোধ করে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে তিনমাস আগে। সাবেক কাউন্সিলর খলিলুর রহমান মজুমদার জানান, গ্রামের বাসায় কেউ থাকে না এবং একটি বাল্বও জ্বলে না। আগে কয়েকমাসের বিল একসাথে পরিশোধ করতাম। যখন দেখলাম একটি বাল্ব না জ্বালিয়েও মাত্রাতিরিক্ত বিল আসে তখন  মিটারটি বন্ধ করে দেই, যাতে বিল না আসে। কিন্তু মিটার বন্ধ করার পর জুন মাসে ৫শ’ ইউনিট ব্যবহার করেছি উল্লেখ করে ১১ হাজার ৫২৪ টাকার বিল পাঠিয়েছে। তাহলে তো চালু থাকাই ভাল ছিল। চালু থাকলে হাজার খানেক টাকা বিল আসতো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লার দ্বিতীয় মুরাদপুরের রুস্তম আলীর ছেলে কাউসার হোসেনের মিটারে বর্তমানে ব্যবহৃত  ইউনিট লেখা আছে ২৬৮৬ ইউনিট। অথচ জুন মাসে পাঠানো বিলে চার্জ করা হয়েছে বর্তমানে ব্যবহৃত ২৯১০ ইউনিট লিখে। তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে ১৫ শ’ ৬৩ টাকার বিল।
একই অবস্থা কুমিল্লার পুলিশ লাইনের এসএ বারি মার্কেটের গ্রামীন অটোর নাজমুল হাসান হিরনের। তা মিটারে বর্তমানে ব্যবহৃত  ইউনিট লেখা আছে ৪৯৮০ ইউনিট। অথচ মে মাসে পাঠানো বিলে চার্জ করা হয়েছে বর্তমানে ব্যবহৃত ৬৩৭০ ইউনিট লিখে।
কুমিল্লা শহরের তেলিকোনা সাহাপাড়ার জয়কুমার পালকেও জুন মাসের বিল দিতে হবে দ্বিগুন। একই বিদ্যুত ব্যবহার করে গত মাসে বিল দিয়েছেন ৭ শ’ ৩০ টাকা আর এ মাসে দিতে হবে ১৩ শ’ ৯৪ টাকা।
কুমিল্লা শহরের মনোহরপুরের একে ফজুলল হক রোডের আবির ইকবাল খান জানান, আগে একটি মিটারে তার বিল আসতো সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। জুন মাসে বিল দিয়েছে ৮ হাজার ১৭৩ টাকা। আরেকটি মিটারে বিল আসতো আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। জুন মাসে বিল দিয়েছে ৬ হাজার ৯৩ টাকা।
৪৯ হাজার টাকা বিল হওয়ায় উদ্বিগ্ন কাপ্তান বাজারের এনামুল হক জানান, ওয়ার্কশপের জন্য তিনি ৪৪০ বোল্টের বিদ্যুৎ সংযোগ নেন। কিন্তু ওয়ার্কশপ চালু করেনি। তিন বছর ধরে ৭৪ টাকা করে বিল আসে। গত জানুয়ারিতে ১৫২ টাকা বিল আসে, ফেব্রুয়ারিতে আসে ৭৪ টাকা। কিন্তু এপ্রিল মাসে ৩ হাজার ইউনিট ব্যবহার করেছি উল্লেখ করে ৩১ হাজার ৫১১ টাকা বিল দেয়। বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ-১ এর অফিসে অভিযোগ নিয়ে গেলে তা কেটে ২০ হাজার টাকা করে জমা দিতে বলে। আবার জুন মাসে আমাকে ৪৯ হাজার ১৩৯ টাকা বিল পাঠায়। এখন আমি কিভাবে এতো টাকা বিল দিবো।
জানা গেছে, শহরের কাপ্তান বাজারের বেশির ভাগ গ্রাহকের বিল দ্বিগুণ দেয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা মিটার রিডারকে প্রশ্ন করলে তিনি আগামী মাস থেকে সমন্বয় করে দেবেন বলে জানিয়েছেন।
বিদ্যুতের গ্রাহকরা অভিযোগ করে জানান, তাদের বাসা বাড়িতে মিটার রিডাররা আসেন না। প্রতিমাসে তাদের গড়ে একটি বিল ধরিয়ে দেয়া হয়। কোন মাসে ৪শ’ ইউনিট, কোন মাসে ৩শ’ ইউনিট। কোন মাসেই এই সংখ্যা কম বেশি হয় না।
প্রাইমেট কোচিং সেন্টারের কর্তধার ইকবাল হোসেন জানান, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রথম ৭ মাস ৪ হাজার ১৫৩ টাকা করে এবং পরের ৪ মাস ৩ হাজার ১২৪ টাকা করে বিল দিয়েছে। প্রত্যেক বারই একই বিল কম বেশি হয় না কখনো।
তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানের মিটারে রিডিং আছে ৭২৫০ ইউনিট আর বিল কপিতে বর্তমান ইউনিট ১২৭৯০ ইউনিট। অর্থাৎ ৫৫৪০ ইউনিট বেশি। আইন অনুযায়ী এই ইউনিট আমি বিদ্যুৎ বিভাগে পাওনা।
এ সব বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে কুমিল্লা বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডে বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের জানান, ১১ হাজার টাকার বিল কেন ৮৬ হাজার টাকা তা বিল দেখে বলতে হবে। তিনি বলেন’ অনেক সময় লোকবলের অভাবে ২/৩ মাসের রিডিং একসাথে নিয়ে সমন্বয় করে দেয়া হয়। ষোল আনা তো সঠিক হয় না। মাঝে মধ্যে ভুল হতে পারে।
টার্গেট পুরণের কোন বিষয় আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান,বিল বাড়িয়ে টার্গেট পুরনের কথা ঠিক না।
এ দিকে বিদ্যুৎ বিভাগে এ সব অনিয়ম ও দুনীতির প্রতিকার সংশ্লিষ্ট কোন মহলে না পেয়ে গ্রাহকদের কেউ কেউ আইনের আশ্রয় নেয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। নাম প্রকাশ না করে তারা জানান, বিষয়টি বিদ্যুৎ সচিব এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে জানানোর চেষ্টা করবেন তারা। যদি এ বিষয়ে প্রতিকার না পান তাহলে মহামান্য হাইকোর্টের সরনাপন্ন হবেন।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs