সর্বশেষ সংবাদ :

দুই মাস সাগরে ভাসছে শত কোটি টাকার গম

Share Button

pic-02_140947

রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ১৯ অক্টোবর ২০১৪।

৩৩ হাজার টন গমের দাম শুল্ককর ছাড়াই ৮৪ কোটি টাকা। সরবরাহ দেওয়ার কথা সরকারের খাদ্য বিভাগকে। কিন্তু শিপিং এজেন্ট ও সরবরাহকারীর মধ্যে বিরোধের কারণে দুই মাসের বেশি সময় গমগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে সাগরে ভাসছে। কবে নাগাদ বিরোধ অবসান হয়ে গমগুলো সরকারি গুদামে পৌঁছবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এমনকি জাহাজভর্তি গমগুলো ৭০ দিন ধরে সাগরে অপেক্ষমাণ থাকায় শুধু বড় জাহাজের ভাড়াই দিতে হবে সাড়ে সাত কোটি টাকা। এর বাইরে সাগর থেকে লাইটারে (বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে স্থানান্তর) করে গম সরকারি জেটিতে পৌঁছাতে আরো কোটি টাকা খরচ করতে হবে সরবরাহকারীকে। এই বিপুল বাড়তি টাকা পরিশোধ করে গমগুলো আদৌ সরকারকে দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম খাদ্য পরিবহন ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি নিয়মে গমগুলো সরকারি গুদামে পৌঁছলেই টাকা পরিশোধ করা হয়। ফলে আপাতদৃষ্টিতে গম না এলেও সরকারের কোনো ক্ষতি নেই। তার পরও চুক্তি মতে নির্দিষ্ট সময়ে গম গুদামে সরবরাহ দিতে সরবরাহকারীকে গত সপ্তাহে চিঠিতে নির্দেশ দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।’ সরবরাহকারী ও শিপিং এজেন্টদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে পণ্য খালাসে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি জানান।

খাদ্য অধিদপ্তরের অন্য একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, চুক্তি মতে এসব গম সরবরাহের কথা ছিল টনপ্রতি ৩২৫ ডলার দরে। চুক্তি হয়েছিল অনেক আগে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দর এখন অনেক কম, ফলে সেই সরবরাহ না দিলেও ক্ষতি নেই। এ জন্য মন্ত্রণালয় ‘ধীরে চলো নীতি’ নিয়ে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের চিঠি দিয়েছে।

জানা গেছে, রুমানিয়া থেকে ৩৩ হাজার টন সরকারি গম নিয়ে ভিরিৎসা জাহাজটি চলতি বছরের ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে আসে। কোরিয়ান কম্পানি সামজিন সরকারি গুদামে এই গম সরবরাহের কাজ পায়। ৩৩ হাজার টন গমবাহী ভিরিৎসা জাহাজ থেকে ১৩ হাজার টন লাইটার করার পর ২০ হাজার টন নিয়ে জাহাজটি বন্দরের সরকারি গম খালাসের সাইলো জেটিতে ভিড়ার কথা ছিল।

কিন্তু খাদ্য অধিদপ্তরকে না জানিয়ে কাস্টমস থেকে কৌশলে অনুমোদন নিয়ে বিগত ৭ আগস্ট গম লাইটার কাজ শুরু করে কোরিয়ান কম্পানির বাংলাদেশের সরবরাহকারী এজেন্ট জে কে শিপিং। তিনটি জাহাজে ছয় হাজার টন স্থানান্তরের পর গমগুলো সরকারি গুদামে না দিয়ে বহির্নোঙ্গর থেকেই বাইরে পাচারের অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের সংবাদ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হওয়ার পরই কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে ৮ আগস্ট ১০ হাজার টন গম লাইটার কাজ অনুমোদন বাতিল করে। একই সঙ্গে ছয় হাজার টন গমসহ তিনটি জাহাজ কাস্টমসের জিম্মায় নেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনটি জাহাজ বন্দরের সাইলো জেটিতে রয়েছে এবং ভিরিৎসা জাহাজে বাকি গম বহির্নোঙ্গরে ভাসছে। যদিও পাচারের বিষয়টি অস্বীকার করে জে কে শিপিংয়ের উপদেষ্টা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘খরচ বাঁচাতে আমরা লাইটার করতে চেয়েছিলাম।’

জাহাজ বাড়তি বসে থাকার খরচের বিষয়ে কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্দরের বহির্নোঙ্গরে একটি জাহাজ বাড়তি সময় অলস বসে থাকার জন্য প্রতিদিন ১৫ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ গুনতে হচ্ছে। তাঁর কথার ভিত্তি ধরেই ৬ আগস্ট থেকে ১২ অক্টোবর ৬৫ দিন ভিরিৎসা জাহাজ সাগরে থাকার ভাড়া আসে সাড়ে সাত কোটি টাকা। এই টাকা জাহাজ মালিককে পরিশোধ করেই গম খালাসের নিয়ম রয়েছে।

এ বিষয়ে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘এই টাকা কিভাবে পরিশোধ হবে তা জাহাজ মালিক ও সরবরাহকারী কোরিয়ান কম্পানি সামজিনই জানে। এরই মধ্যে আরেকটি কম্পানিকে দিয়ে গম লাইটারের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের টাকা পরিশোধ করলে গম লাইটার করব, অন্যথায় নয়। অন্তত চুক্তির ৫০ শতাংশ টাকা অগ্রিম দিলেই গম সরবরাহ শুরু করতে পারব।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার অন্তত ৩০ দিন আগে গমগুলো জাহাজে ভর্তি করা হয়েছে। সেই থেকে গতকাল পর্যন্ত তিন মাসে গমগুলো জাহাজে থাকায় এর মান নিয়ে বেশ প্রশ্ন উঠেছে। কেননা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিভিন্ন কীটনাশক স্প্রে করে জাহাজে থাকা গমের মান ঠিক রাখা হয়। গমের মান নিয়ে অভিযোগ মন্ত্রণালয়েও জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। তবে গমের মান ঠিক আছে দাবি করে কামরুল ইসলাম বলেন, ঈদের আগেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

এদিকে জে কে শিপিংয়ের বিরুদ্ধে আগের বকেয়া টাকা না দেওয়ায় নতুন করে লাইটার জাহাজ সরবরাহ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছোট জাহাজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডাব্লিউটিসি)

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs