সর্বশেষ সংবাদ :

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আবারও কি ‘গুরু শিষ্যের’ লড়াই!

Share Button
সূচিপত্র
রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ১৮ অক্টোবর ২০১৪।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনে জিতেছিলেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলম। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন তিনি। প্রথমবার মেয়র নির্বাচন করেই প্রভাবশালী প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে দিয়ে ব্যাপক চমক সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। কারণ, এর আগে টানা তিন দফায় মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। সে সময় মনজুর আলম ছিলেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১০ সালের ১৭ জুন। ওই নির্বাচনে বিএনপি থেকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন পাওয়ার আগে মনজুর আলম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। সে সময় মহিউদ্দিন চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন তিনি। রাজনীতিতে তাঁদের সম্পর্ক ছিল অনেকটা গুরু-শিষ্যের মতো। মনজুর আলমের চেয়ে বয়সেও পাঁচ-ছয় বছরের বড় মহিউদ্দিন চৌধুরী। সব মিলিয়েই দুজনের দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরু-শিষ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরী যখন পরপর তিন দফায় মেয়র নির্বাচিত হন, তখন শিল্পপতি মনজুর আলমও উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড থেকে পরপর তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন গত মহাজোট সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মহানগর বিএনপির একাধিক প্রার্থীর নাম আলোচনায় ছিল। তবে আওয়ামী ঘরানার নেতা হিসেবে পরিচিত মনজুর আলম হঠাৎ করেই পেয়ে যান তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মনোনয়ন। মহাজোট সরকারের আমলে এটাই ছিল প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আর তাতে আওয়ামী লীগ থেকে তিনবারের নির্বাচিত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ৯৫ হাজার ৫২৮ ভোটে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেন মনজুর আলম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কাছে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থীর পরাজয় নিয়ে সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
সেই নির্বাচনের পর ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে চার বছর চার মাস। গত ৭ আগস্ট চট্টগ্রাম সফরকালে নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী বছরের জুন মাসে রমজান মাস পড়বে। রমজানে নির্বাচন কমিশন কোনো নির্বাচনের আয়োজন করে না। এ ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিন আগে এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হতে পারে। সে হিসাবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নির্বাচনের আর বাকি ছয়-সাত মাস। তফসিল ঘোষণা না হলেও মনোনয়নপ্রত্যাশী সম্ভাব্য প্রার্থীরা বসে নেই। আসন্ন এ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য দলীয় প্রার্থীদের আগাম তৎপরতাও শুরু হয়ে গেছে।
সময়মতো নির্বাচন হলে তা হবে এ সরকারের আমলে প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। তাই আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এখন থেকেই নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বিএনপি গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সে ক্ষেত্রে তারা এ সরকারের অধীনে সিটি নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবে কি না তা নিয়েও জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে। তবে সব কিছুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সেই ‘গুরু-শিষ্যের লড়াই’ নিয়েই।
গতবারের নির্বাচনে বিজয়ের পর মনজুর আলমকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর মহিউদ্দিন চৌধুরী বছরখানেক আগে দ্বিতীয়বারের মতো চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দুজনে কি ফের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে লড়বেন, নাকি এবার নির্বাচনে নতুন নতুন মুখ আসছে তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলে এম মনজুর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আরো আট-নয় মাস সময় আছে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র নেওয়ার বিষয়ে এখনো চিন্তা করিনি। দল থেকে তো এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নিজের কাজের মূল্যায়ন নিজে করব। শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ভালো থাকাসহ সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ওই সময় চিন্তা করব।’
আগামী সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করে মহিউদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নগরবাসীর সুখে-দুঃখে পাশে আছি। দলের কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এ ছাড়া নির্বাচন করতে আমারও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে। তাই দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দোয়া এবং সহযোগিতা কামনা করছি।’
তবে উভয় পক্ষের সূত্রগুলো বলছে, আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে মনজুর আলম ও মহিউদ্দিন চৌধুরীকে জটিল পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। কারণ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের মধ্যে গতবারের চেয়ে এবার গ্রুপিং আরো বেশি। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাইবেন না। গতবার মেয়র পদে আওয়ামী লীগের সমর্থনপ্রত্যাশী ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। সে সময় তাঁর বিরোধী ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী। কেন্দ্র থেকে শেষ পর্যন্ত মহিউদ্দিন চৌধুরীই দলীয় টিকিট পান। গতবার মহিউদ্দিনের বিরোধী ছিলেন একজন। এবার আছেন চারজন। তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নুরুল ইসলাম বিএসসি, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাসির উদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী এবং কোষাধ্যক্ষ ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালাম। গত মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কালের কণ্ঠকে জানান, মেয়র নির্বাচনে দলের সমর্থনপ্রত্যাশী তাঁরা। তবে দলীয় সভাপতি যাঁকে মনোনয়ন দেবেন তাঁকেই মেনে নেবেন তাঁরা। দলের অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগ টানা দুইবার সরকার গঠন করলেও মহিউদ্দিন চৌধুরী তেমন কিছু পাননি। তাই শেষ পর্যন্ত তাঁর ওপরেই ভরসা রাখতে পারে দল।
মেয়র পদে দলীয় সমর্থন নিয়ে মনজুর আলমও খুব একটা স্বস্তিতে থাকতে পারবেন না। গতবারের নির্বাচনে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে যে কয়জন তাঁর পক্ষে কাজ করেছেন তাঁদের একজন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন। এবার শাহাদাত ছাড়াও আরেক বিএনপি নেতা কাজী আকবরও মেয়র পদে দলের সমর্থনপ্রত্যাশী। মনজুরের এখনো কোনো প্রচারপত্র দেখা না গেলেও বাকি দুজনের নামে পোস্টারে ছেয়ে গেছে নগরের বিভিন্ন এলাকা।
এ ছাড়া অভিযোগ উঠেছে, মনজুর আলম যেসব উন্নয়নকাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়েছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগই এখনো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা ছিল জলাবদ্ধতা। এখনো অল্প বৃষ্টিতেই নগরের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
তবে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মনজুর আলমের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত হয়তো মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে তিনিই টিকে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের মাঠে আবার মুখোমুখি হবেন গুরু-শিষ্য।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs