সর্বশেষ সংবাদ :

ড.পিয়াস কে মানুষ এত কেন ভালোবাসে:–ফরহাদ মজহার

Share Button

3470_1

ড.পিয়াস কে মানুষ এত কেন ভালোবাসে:–ফরহাদ মজহার

রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ১৮ অক্টোবর ২০১৪।

যারা পিয়াসের জানাজায় গতকাল অংশগ্রহণ করেছেন ও তাঁকে কাঁধে বয়ে নিয়ে বনানীতে রেখে এসেছেন পিয়াসের বিশাল বন্ধু মহল থেকে তাদের প্রতি অপার কৃতজ্ঞতা ও নিরন্তর ভালবাসা।

শুনি, অনেকে প্রায়ই বলে, পিয়াস করিম একসময় মার্কসবাদী ছিলেন, এরপর তাঁর চিন্তা ভিন্ন মোড় নিয়েছে। এগুলো মিথ্যা, ফালতু প্রচার। ডাস্টবিনে ফেলে দিন।

কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ও ইসলামপন্থী রাজনীতির বিশাল একটি অংশ পিয়াস করিমকে ভালবাসলেন কেন? তারা তাঁর আদর্শ ও নীতিনিষ্ঠার জন্যই জন্যই তাঁকে ভালবেসেছেন। সে কারনেই বায়তুল মোকাররমে তাঁর জানাজায় তারা বিপুল ভাবে অংশ গ্রহণ করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি গরিব ও মজলুম মানুষের খেদমত করেছেন বলে জানাজায় দাঁড়িয়ে তাঁর পক্ষে সাক্ষী হয়েছেন এবং তাঁকে জান্নাতবাসী করবার জন্য আল্লার কাছে দুই হাত তুলে মোনাজাত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে এই দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সহনশীলতা, ঔদার্য ও মহানুভবতা যেমন প্রতিষ্ঠিত হোল একই সঙ্গে ইসলামপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোল। মজলুমের বন্ধু ও ইনসাফ কায়েমের সৈনিক মাত্রই ইসলামের সহযাত্রী এই সত্য বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রমাণ করে দিল। আমি বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণকে অভিনন্দন জানাই।

না। পিয়াসের চিন্তা কখনই কোন ভিন্ন মোড় পরিগ্রহণ করে নি। জর্মন ভাবাদর্শের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে জগত ও ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করবার যে পদ্ধতি কার্ল মার্কস হাজির করেছিলেন ডক্টর পিয়াস করিম তার সনিষ্ঠ অনুরাগী ও অনুসারী ছিলেন সবসময়ই। বাংলাদেশ হাতেগোনা দুই একজন যারা মার্কসীয় অর্থশাস্ত্র ও সমাজতত্ত্ব একাডেমিক পরিমণ্ডলে পড়েছেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন — পিয়াস তাদের একজন। তিনি ভূয়া মার্কসবাদী ছিলেন না। গবেষণার ক্ষেত্র ছিল কিউবার আখচাষের অর্থনীতি ও সাম্রাজ্যবাদ। অধ্যাপক হিসাবে তিনি ছিলেন সফল ও তুমুল জনপ্রিয় শিক্ষক। বিপ্লব, মার্কস ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক অনুসন্ধিৎসা ও নিষ্ঠা ছিল প্রবল। যার স্পিরিট তিনি মার্কসের কাছ থেকেই অর্জন করেছেন। সেই স্পিরিটের সারকথা হচ্ছে, কোন কিছুই পর্যালোচনার বাইরে নয়, খোদ কার্ল মার্কসও বিচারের উর্ধে নন। ভাবি, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা তাঁর ছাত্র হতে পেরেছিলেন, তারা ছিলেন সৌভাগ্যবান।

কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কী সম্ভব আর কী সম্ভব না সেই গুরুত্বপূর্ণ তর্ক আমরা বেকুবের মতো এড়িয়ে যেতে পারি না। পিয়াস বেকুব বামপন্থী ছিলেন না। ফলে অল্প সময়েই সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পেরেছেন। বিপ্লবের ধারণাকে রোমান্টিক উৎকল্পনা থেকে মুক্ত করা জরুরী, এটাও তিনি জানতেন। যাতে বাংলাদেশে বিপ্লবের নামে আসলে কী অর্জন করতে চাই এবং কী আসলে অর্জন করা সম্ভব সে বিষয়ে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্মতি তৈয়ার করার প্রয়োজনীয়তা তিনি হাড়ে হাড়ে বুঝতেন। কিন্তু সম্মতি তৈয়ারির পরিবেশ ছাড়া সেটা কিভাবে সম্ভব?

ঠিক।এক ধাপে বা এক লাফে কিছুই অর্জন সম্ভব না। এখন দরকার চিন্তা ও পর্যালোচনার জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আশু কর্তব্য নির্ধারণের পরিবেশ তৈরির জন্য সবার আগে কী দরকার? দরকার চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারগুলো অর্জন। এর কোন বিকল্প নাই। এই অর্থেই বাংলাদেশের বাস্তবতায় পিয়াস দৃঢ়তার সঙ্গে উদার রাজনীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। বাংলাদেশের এখনকার পরিস্থিতির জন্য এটাই ছহি পথ।

লেনিন বলতেন, ‘মার্কসবাদ’ নামক বিমূর্ত কোন ‘বাদ’ বা ‘ইজম’ নাই। প্রতিটি দেশের জনগণকেই তাদের বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে মার্কসকে বুঝতে, জানতে ও প্রয়োগ করতে শিখতে হবে। লেনিন শিখেছিলেন; তাই গরিব ও সর্বহারার ক্ষমতা নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিগঠনের বিজ্ঞানী হিসাবে বিপ্লব সফল করতে পেরেছিলেন। ‘আধুনিক’ যুগে বিপ্লবের বিজ্ঞান রপ্ত করতে হলে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের বিকল্প আজও তৈরি হয় নি। কৃষি প্রধান চিনে মাও জে দং আরেকটি রূপ দেখিয়েছিলেন, তিনিও অমর হয়ে আছেন।

আমরা একদিকে যেমন অনেক পিছিয়ে আছি, অন্যদিকে পৃথিবীও আর লেনিনের রাশিয়া আর মাও জে দং-এর চিন নয়। এটা ২০১৪ সাল।

পিয়াস দিবাস্বপ্নে ভুগতেন না। বহু নতুন আপদ ও আবর্জনা আমাদের সাফ করতে হবে। একজন দুর্দান্ত সহযোদ্ধা ও সহকর্মী হারানোর ক্ষতি অপূরণীয়।

সবাইকে আবারও কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs