সর্বশেষ সংবাদ :

আইনের লোকের বেআইনি কাজ

Share Button
images1
রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম ঢাকা, ১৩ অক্টোবর ২০১৪।
আইনের লোক হয়ে বেআইনি কাজ করতে গিয়ে আইনের হাতেই ধরা পড়লেন ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তাজুল ইসলাম। বিচারের নামে নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে আমির হোসেন নামে এক আসামির বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করেছেন। জরিমানার ৬০ হাজার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিলেও নগদে জব্দ করা ৯১ হাজার ৫০০ টাকা নিজের কাছেই রেখে দেন তিনি। পরে ওই আসামির আপিল দায়েরের খবর শুনে প্রায় দুই মাস বাদে তড়িঘড়ি করে ওই টাকা মুন্সীগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জমা দিয়ে আÍরক্ষার চেষ্টা করেছেন। আর এসব অনিয়মের বিবরণ উঠে এসেছে আসামির আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে মুন্সীগঞ্জের দায়রা জজের দেয়া রায়ে। তাতে আরও বলা হয়েছে, ন্যায়বিচার ও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের এ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
দায়রা জজ আদালতের দেয়া রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার ৭৪ ও ৭৫ বিধি অনুযায়ী অপরাধ সংগঠনের কোনো অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিধিতে ওই আসামিকে সাজা দিয়েছেন ম্যাজিস্ট্রেট মো. তাজুল ইসলাম। যদিও আসামির বিরুদ্ধে দেয়া রায়ে অভিযোগকারীর নাম উল্লেখ করেননি তিনি।
এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময়। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট উপজেলার বিএনপি সমর্থক চেয়ারম্যান প্রার্থী আলী আজগরের সমর্থক আমির হোসেন দোলনকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। ২১ জুলাই মুন্সীগঞ্জের দায়রা জজ এম আতোয়ার রহমান এ দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের রায় দেন। তাতেই ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের বেআইনি কাজের চিত্র ফুটে ওঠে।
দায়রা জজ এই ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও অধিকতর তদন্তের জন্য রায়ের কপি আইন সচিব ও সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার বরাবর পাঠিয়েছেন। জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিমকোর্টের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এসএম কুদ্দুস জামান বলেন, আমরা ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি হাতে পেয়েছি। আগামী জিএ (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) কমিটির সভায় এটা উত্থাপন করা হবে।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, টঙ্গীবাড়ি উপজেলা নির্বাচন হয়েছে ৩১ মার্চ। ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় স্থানীয় আড়িয়াল বালিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমির হোসেনকে ৯১ হাজার ৫০০ টাকাসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব-১১ এর সদস্যরা। পরের দিন র‌্যাবের এসআই রিপন কুমার দাস বাদী হয়ে ভোট ক্রয়ের অভিযোগে নির্বাচন বিধিমালা-২০১৩ এর ৩ ধারা অনুযায়ী টঙ্গীবাড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। কিন্তু নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী তাৎক্ষণিক বিচারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের কাছে কোনো অভিযোগ দায়ের না করা সত্ত্বেও ৩০ মার্চ থানায় হাজির হয়ে নির্বাচনী বিধিমালা-২০১৩ এর ৭৪ ও ৭৫ বিধিতে জরিমানার দণ্ড প্রদান করেন। ২৯ তারিখে গ্রেফতার হওয়া আসামি আমির হোসেন পুলিশের হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও ৩০ তারিখে ভিন্ন অপরাধ সংগঠন দেখিয়ে দণ্ড হিসেবে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। জব্দ করা ৯১ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম। এক মাস পর ৩০ এপ্রিল আমির হোসেন এই দণ্ডের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জের দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন।
আপিলের রায়ে মুন্সীগঞ্জের দায়রা জজ উল্লেখ করেছেন, আপিলকারী আসামিকে ২৯ মার্চ তারিখে নগদ টাকাসহ গ্রেফতার করে থানায় সোপর্দ করার পর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অপ্রযোজ্য বিধি উল্লেখ করে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ডিত করেন এবং অসৎ উদ্দেশ্যে জব্দকৃত টাকার বিষয়ে রায়ে বা রেকর্ডে না এনে এজাহার, জব্দ তালিকা, জব্দকৃত টাকা ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র নিজ হেফাজতে রাখেন। আপিল দায়েরের সংবাদ শুনে তড়িঘড়ি করে খণ্ড নথিমূলে সেগুলো চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রেরণ করেন। ন্যায়বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের এসব কার্যকলাপের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া আবশ্যক।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের কাছে কোনো অভিযোগ না করা সত্ত্বেও তিনি আমির হোসেনের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ গঠন করেন। ২৯ মার্চ গ্রেফতার হয়ে থানায় পুলিশ হেফাজতে থাকলেও তাকে ৩০ মার্চ রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টায় টঙ্গীবাড়ির সোনারংয়ে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার ৩২ ঘণ্টার মধ্যে প্রথমত, আক্রমণাত্মক কাজ ও বিশৃঙ্খলামূলকভাবে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং দ্বিতীয়ত, সোনারং সিরাজ মৃধার বাড়ির সামনে ভোট কেন্দ্রের নিকটস্থ স্থানে ভোট গ্রহণের দিন রাতে প্রচারণা করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা-২০১৩ এর যথাক্রমে ৭৪(১) (২) ও ৭৫(১)(২) বিধি মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন মর্মে দোষী সাব্যস্ত করে ৭৪(১)(২) অনুযায়ী ৫০ হাজার ও ৭৫(১)(২) অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
এ ব্যাপারে দায়রা জজ তার রায়ে উল্লেখ করেছেন, অভিযোগে বর্ণিত সময়ে আসামি র‌্যাব/পুলিশের হেফাজতে থাকাবস্থায় তার দ্বারা কোনোরূপ অপরাধ সংঘটনের সুযোগ ছিল না। এছাড়া এসআই রিপন তার এজাহারে আসামির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা-২০১৩ এর বিধি ৭৪(১)(২) ও ৭৫(১)(২) এর আওতাধীন অপরাধ নয়। এসব ধারা মোতাবেক অপরাধ সংঘটনের কোনো অভিযোগকারী নেই বা কথিত অপরাধ ওই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সংঘটিত হয়েছে বা তার দ্বারা উদ্ঘাটিত হয়েছে সে মর্মে কোনো অভিযোগ নেই। ৩১ মার্চ নির্বাচন শুরু হওয়ার ৩২ ঘণ্টার বেশি সময় আগে থেকেই আসামি র‌্যাব/পুলিশের হেফাজতে ছিলেন।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা-২০১৩ এর বিধি ৮৪(ক)-এ উল্লেখিত বিধি ৭২, ৭৪, ৭৫, ৭৬, ৭৭(১) এবং ৭৮ বিধির অধীন নির্বাচনী অপরাধগুলো আমলে নেয়া ও তা সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য ক্ষমতা দেয়া হয় বিচারিক দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের। এসব বিধি অনুযায়ী নির্বাচন শুরু হওয়ার ৩২ ঘণ্টা আগে থেকে ভোট শুরুর পরবর্তী ৬৪ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে এসব ধারায় সংঘটিত অপরাধগুলো আমলে নিতে পারেন এসব ম্যাজিস্ট্রেট। নিয়মিত কোনো মামলা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের বিচার্য বিষয় নয়। কিন্তু তারপরও ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে এই নিয়মিত অপরাধের বিচার করে জরিমানা আদায় করেছেন এবং আসামিকে বিনা জামিনে মুক্তি দিয়েছেন।
মামলার নথি থেকে দেখা গেছে, ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম নিজ হাতে দুটি ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিখেছেন এবং ১০০ টাকার অপর একটি স্ট্যাম্প আসামির স্বাক্ষরিত অলিখিত অবস্থায় রয়েছে। আপিল শুনানিকালে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, ম্যাজিস্ট্রেট ভয়ভীতি দেখিয়ে ৩টি অলিখিত স্ট্যাম্পে আসামির স্বাক্ষর নিয়ে নিজ হেফাজতে নিয়েছিলেন এবং আপিল দায়েরের সংবাদ শুনে ম্যাজিস্ট্রেট নিজের হাতে কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা লিখে দুটি স্ট্যাম্প পূরণ করলেও একটি স্ট্যাম্প অলিখিত রয়েছে। এগুলো মামলার মূল নথির সঙ্গে প্রেরণ না করে খণ্ড নথির সঙ্গে প্রেরণ করেন। এছাড়া একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে নিজ হেফাজতে কেন রেখেছিলেন তা রহস্যজনক বলে রায়ের কপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, এ মামলায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তাজুল ইসলামের কার্যকলাপে বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়। (ক) অজ্ঞাত কারণে ওই ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের দুটিতে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেছেন। (খ) যে কারণেই স্ট্যাম্পে জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হোক না কেন, তা মূল নথির সঙ্গে সংযোজন করা হয়নি। (গ) এছাড়া অপর একটি অলিখিত স্ট্যাম্পে আসামির স্বাক্ষর নিয়ে নিজ হেফাজতে রেখেছিলেন। (ঘ) যে এজাহারের ভিত্তিতে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ডিত করা হয়েছে উক্ত বিষয়ে অভিযোগ গঠন করেননি বা তার রায়ে কিছু উল্লেখ করেননি বা নগদ টাকা জব্দ করার বিষয় রেকর্ডে আনেননি। (ঙ) আসামিকে নির্বাচনী অপরাধ মামলা নং ১/১৪-তে দণ্ডিত করে উক্ত মামলার আলামত হিসেবে জব্দনামা বা জব্দকৃত ৯১ হাজার ৫০০ টাকা ও আনুষঙ্গিক কাগজাদি স্মারক নং-৪৮৮ মূলে ৩০ এপ্রিল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জমা প্রদান করেছেন। এসব বিষয় তদন্ত হওয়া আবশ্যক বলে মন্তব্য করেছেন দায়রা জজ।
আপিলের রায়ে আসামিকে অভিযোগ থেকে খালাস দিয়ে ওই ম্যাজিস্ট্রেটের জরিমানার আদেশ বাতিল করেছেন দায়রা জজ। একই সঙ্গে আসামি আমির হোসেনের কাছ থেকে জরিমানা বাবদ আদায় করা ৬০ হাজার এবং জব্দ করা ৯১ হাজার ৫০০ টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
জানতে চাওয়া হলে ভুক্তভোগী আমির হোসেন রোববার যুগান্তরকে বলেন, আমি ৯১ হাজার ৫০০ টাকা ফেরত পেয়েছি। আদালতের মালখানা থেকে টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। বাকি ৬০ হাজার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দেয়া হয়েছিল। এই টাকা ঢাকা থেকে উঠাতে হবে। এখনও হাতে পাইনি। তিনি আরও বলেন, আমাকে চেয়ারম্যান প্রার্থী আলী আজগর রিপনের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে র‌্যাব মামলায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে সিরাজ মৃধার বাড়ির সামনে থেকে গ্রেফতারের কথা বলে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এক নারীকে পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগে তার নিজ এলাকা সাতক্ষীরায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। ২১ আগস্ট জাহানারা খাতুন বাদী হয়ে সাতক্ষীরার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর ১৮৯/১৪।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs