সর্বশেষ সংবাদ :

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ বিষয়ক সেমিনার : নির্বাচন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অপরিবর্তিত

Share Button
1412960759.
রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০১৪।
আহমদ আতিক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে : বাংলাদেশের গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি বলে উল্লেখ করেছেন  দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত উপ-সহকারী মন্ত্রী টেড ব্রাউন। একইসাথে গ্রমীণ ব্যাংকের সাফল্য নিয়েও প্রশংসা করেন তিনি। গত সোমবার ওয়াশিংটনে ‘বাংলাদেশ : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। আমেরিকান সিকিউরিটি প্রজেক্ট-এএসপি ওই সেমিনারের আয়োজন করে। ওয়াশিংটন ডিসির নিউইয়র্ক এভিনিউর ওয়েস্ট টাওয়ারে যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে মার্কিন থিংক থ্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান আমেরিকান সিকিউরিটি প্রজেক্ট-এএসপি এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস)।
এএসপি এবং বিআইপিএসএস’র উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে বাংলাদেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা উভয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে এ অঞ্চলের সাম্প্রতিক অবস্থা এবং বাংলাদেশে চীনা প্রভাব বৃদ্ধির বিষয় প্রাধান্য পায়। এছাড়া সামনের দিনগুলোর পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে তা নিয়ে আলোচনা হয়। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রভাব, উপমহাদেশের নতুন আল কায়েদা, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মার্কিন উপ-সহকারী মন্ত্রী টেড ব্রাউন ছিলেন সেমিনারের মূল বক্তা। লিখিত বক্তব্যের পর সেমিনারে উপস্থিত বাংলাদেশের একুশে টিভির প্রতিনিধি ইমরান আনসারীর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নে অনড় অবস্থানেই রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা অবিলম্বে সত্যিকার একটি নির্বাচন চায় এবং এ জন্য তাগিদ অব্যাহত রেখেছে।
টেড ব্রাউন তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশকে সবরকম সহায়তা দিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি তার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, আমি নিজে একজন কূটনীতিক হিসেবে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি দেশটির মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং কাজের ব্যাপারে খুবই নিষ্ঠাবান। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেশটির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। কিন্তু এর সত্যিকার সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগের একটি টেকসই স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা খুব জরুরী। আর সে জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে উত্তম পথ। একই সঙ্গে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থাও অপরিহার্য। পাশাপাশি তিনি  সন্ত্রাসবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
তিনি আরো বলেন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হবে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার। ইউএসএইডের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকা-ে অর্থায়ন করবে যুক্তরাষ্ট্র। যে তিনটি খাতকে প্রাধান্য দেয়া হবে তা হচ্ছে জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা।
বিআইপিএএস সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান বলেন, দেশে ভয়াবহ নিরাপত্তার অভাব রয়েছে এখন। এ অবস্থায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী। তিনি বলেন, আমাদের রয়েছে ভয়াবহ নিরাপত্তা বাধা। তারপরও রয়েছে অপার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রহীনতা ও মানবাধিকার বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন ড. পিয়াস করিম।
তিনি বলেন, যেকোনো দেশের জাতীয় রাজনীতি বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। আমাদের অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে এবং হচ্ছেও। কিন্তু দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, একদলীয় শাসনসহ নানা কারণে সেই উন্নতি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সম্পর্কেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, নব্বই দশকের গোড়ার দিক থেকে একটি গণতান্ত্রিক ধারা শুরু হয়, যা বেশ কিছুকাল নির্বিঘেœ এগিয়ে যেতে থাকে। এখানে পাঁচ বছর পর পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছায় এবং এই ব্যবস্থাটি সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়। ইতিপূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত কয়েকটি নির্বাচন বড় রকমের অভিযোগ ছাড়াই দেশে-বিদেশে সকল মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। কিন্তু বর্তমান সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে একতরফাভাবে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাটি তুলে দেয়ার প্রেক্ষিতে দেশটি এক লাগাতার সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। ইতিমধ্যেই গত ৫ই জানুয়ারি সরকার নিজেদের অধীনে একটি একদলীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেছে, যেখানে বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি এবং সে কারণে ১৫৩টি আসনে কোন নির্বাচন ছাড়াই পছন্দের প্রার্থীদেরকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। মূলত এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণরূপে গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র না থাকার সুযোগে বাংলাদেশে নতুন করে জঙ্গিবাদ তথা সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অধ্যাপক ড. টমাস লিনচ বলেন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কোন কোন দেশে ইসলামী জঙ্গিবাদ একটি বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যেহেতু এটি একটি আঞ্চলিক সমস্যা, তাই কোন একক দেশের পক্ষে এই সমস্যার কার্যকর সমাধান বের করা সম্ভব নয়। এ জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং যৌথ উদ্যোগ জরুরী। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দাবি করছে যে, তাদের দায়িত্বকালেই জঙ্গিবাদ নির্মূলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন রকম অংশীদারিত্ব ও যৌথ উদ্যোগ নিতে তারা সমর্থ হয়েছে। এটা হয়ে থাকলে তা প্রশংসনীয়।
বিআইপিএএস-এর ফেলো সাফকাত মুনীর বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামী জঙ্গিবাদের সমস্যা অনস্বীকার্য। তবে বাংলাদেশে এই সমস্যা ততটা প্রকট নয়, যতটা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। অবশ্য একটি মহল বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদের বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাজারজাত করে থাকে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তিনি বলেন, সম্প্রতি ইসলামিক স্টেটকে এখনই প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
টমাস লিনচ-এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সাফকাত বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিরোধী বিভিন্ন রকম আইনি ও বাস্তব পদক্ষেপ শুরু হয়েছিল ২০০৩ সাল থেকে। প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, বিশেষ এলিট ফোর্স হিসেবে র‌্যাব গঠন এবং বিভিন্ন ধরনের বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে সেই সময় থেকেই। এমনকি শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাইসহ শীর্ষ পর্যায়ের বেশ ক’জন জঙ্গি নেতা আটক হন বিএনপি সরকারের আমলে এবং তাদের বিচার শেষে মৃত্যুদ- কার্যকরও হয় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই। সুতরাং কোন একক সরকারকে এ জন্য কৃতিত্ব দেয়ার সুযোগ নেই।
পর্যবেক্ষকের বক্তব্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাস একটি সমস্যা বটে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সব রকম সন্ত্রাসকে ছাড়িয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য বর্তমান সরকার যেভাবে বেপরোয়া রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে, ভিন্নমতের লোকজনকে নির্বিচারে হত্যা করছে, তাতে এই সরকারকে দিয়ে সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- তথা জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করা কিছুতেই সম্ভব নয়।
দুই পর্বের এই সেমিনারে বাংলাদেশ থেকে অংশ নেন বিআইপিএসএস-এর সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনীরুজ্জামান ও সহকারী রিসার্চ ফেলো সাফকাত মুনীর, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক পিয়াস করিম। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  আমেরিকান সিকিউরিটি প্রজেক্ট-এর পক্ষে অংশ নেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্টিফেন এ চেনী, ড. থমাস লিঞ্চ ও দান্তে ডিসপার্তে প্রমুখ। সেমিনারের প্রথম পর্বে ‘বাংলাদেশ: পলিটিক্যাল ক্লাইমেট এন্ড সিকিউরিটি চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন বিআইপিএসএস সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনীরুজ্জামান। দ্বিতীয় পর্বের ‘বাংলাদেশ: অর্থনৈতিক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন এএসপি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্টিফেন এ. চেনি।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs