সর্বশেষ সংবাদ :

লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের মাটি বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে

Share Button
1412959324
রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০১৪।
প্রাচীন সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড় থেকে দিনে-রাতে মাটি কেটে চলেছে একটি চক্র। ট্রাক ভরে সেই মাটি বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে। সবুজ-শ্যামল পাহাড় হারাতে বসেছে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। স্থানীয় প্রশাসন মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে রীতিমত অসহায়। কিছু অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করে তৈরি করছে বাংলো, কটেজ। পর্যটন ব্যবসার নামে সেখানে হচ্ছে নানা ধরনের অপকর্ম। এদিকে, ক্রমাগত মাটি কাটার ফলে লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ে আবিষ্কৃত প্রাচীন নিদর্শনগুলো তথা আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা পাহাড় কেটে উজাড় করছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে এই মাটিদস্যুরা তাদের সমর্থক বনে যায়। আবার প্রশাসনের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার কাছেও মোটা অংকের টাকার ভাগ যায়। যার কারণে প্রশাসনের এই অংশটি তাদের বিরুদ্ধে কিছু করে না। আইন অমান্য করে ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ের অংশ কেটে প্রতি ট্রাক্টর মাটি ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকা করে দেদারসে বিক্রি করছে অনেকে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে থামছে না পাহাড়ের মাটি কাটা। পাহাড়ের মাটি উর্বর বলে অনেকে এগুলো ব্যবহার করছে জমিতে। পাহাড়ি মাটি দিয়ে তৈরি ইট তুলনামূলক শক্ত হয় বিধায় অনেকে এগুলো দিয়ে ইটও তৈরি করছে। এছাড়া অনেকে এখানকার মাটি দিয়ে নিচু এলাকা ভরাট করছে।
আগে পাহাড়ের মাটি কাটা বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলেও এখন আর তেমনটি দেখা যায় না। মাটিদস্যুদের কবলে পড়ে এ পাহাড়টির অবকাঠামো ও ঐতিহ্য ক্রমে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। লালমাই পাহাড়ের বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেন প্রকল্পের জন্যও এ পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা থেকে মাটি কাটা হয়। জাল, ভুয়া দলিল-খতিয়ান বানিয়ে প্রশাসনের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ঐতিহ্যবাহী এ পাহাড়ের ভূমি নিজেদের নামে-বেনামে কাগজপত্র করে নিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব কারণে নান্দনিক সৌন্দর্যমন্ডিত এ পাহাড়ের আয়তনও ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। অনেক সময় মাটির সঙ্গে অনেক পুরাকীর্তি বেরিয়ে আসে। এগুলো ভূমিদস্যুরা পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয়।
ইজারা নিয়ে পাহাড় দখল: এ পাহাড়ে বন বিভাগের জমি, সরকারের খাস ভূমি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রয়েছে। রাজনীতিক, প্রাক্তন জেলা প্রশাসক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার প্রভাবশালী লোকজন খাস ভূমি ইজারা নিয়ে পাহাড় দখল করছে। কুমিল্লার প্রাক্তন একজন জেলা প্রশাসকের বাংলো চোখে পড়েছে গহীন পাহাড়চূড়ায়। অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা পর্যটন কেন্দ  করার লক্ষ্যে খাস ভূমি ছাড়াও ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ের ভূমি খরিদ করছে।
লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়ের অবস্থান: কুমিল্লা জেলার মধ্যবর্তী স্থানে ও শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ যে অনুচ্চ ও সরু পাহাড়শ্রেণী আছে, তার দক্ষিণ ভাগ ‘লালমাই পাহাড়’ ও উত্তর ভাগ ‘ময়নামতি পাহাড়’ নামে পরিচিত। জেলার আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, বুড়িচং ও বরুড়া উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের অবস্থান। পাহাড় ও পাহাড় সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় অর্ধশত গ্রাম রয়েছে। প্রায় ১৮ কিলোমিটার লম্বা এই পাহাড়শ্রেণী ১ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত। পাহাড়ের উত্তর দিকের শেষ প্রান্তে আছে রাণী ময়নামতির টিলা এবং   দক্ষিণ দিকের শেষ সীমানায় রয়েছে চন্ডীমুড়া। ঢাকা-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম পাকা মহাসড়ক ময়নামতি পাহাড়কে (সেনানিবাস এলাকা) ভেদ করে চলে গেছে। এ ময়নামতি পাহাড়ের দক্ষিণ সীমা থেকে একেবারে দক্ষিণের চন্ডীমুড়া পর্যন্ত সমুদয় পাহাড়ী অঞ্চল ‘লালমাই’ নামে পরিচিত। এই সড়কের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত কিছু অংশ এবং উত্তর দিকের সব অংশ নিয়ে গঠিত ‘ময়নামতি’ পাহাড়। গড়ে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়শ্রেণীর টিলাগুলোর উপরিভাগ প্রায় সমতল।
লালমাই-ময়নামতি পাহাড় খননকার্যের ফলে অতি প্রাচীন এবং অতি মূল্যবান এমনসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে যা বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের এক অতি গৌরবময় যুগের সন্ধান দিচ্ছে। সন্ধান দিচ্ছে মানব সভ্যতার এক বিস্ময়কর অগ্রগতির অম্লান অধ্যায়ের। এ পাহাড় ঘিরে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব ভাণ্ডার, রাজবংশের প্রাচীন কীর্তি, অর্ধশতাধিক মুড়া বা টিলা, অসংখ্য প্রাচীন দীঘি-পুষ্করিণী, সেনানিবাস, বিজিবি সদর দফতর, মসজিদ-মাজার, মন্দির, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-স্থাপনা ও পর্যটন এলাকা।
রাজাদের রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ: লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণীর প্রায় সমগ্র এলাকা জুড়ে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তির অস্তিত্ব রয়েছে। শোনা যায়, এ স্থানে ৯৯ জন রাজা পর্যায়ক্রমে রাজত্ব করে গেছেন। তবে তাদের সবার সন্ধান পাওয়া না গেলেও কমপক্ষে ৮টি রাজবংশের প্রায় ৩০ জন রাজা যে এখানে রাজত্ব করে ছিলেন তার নিদর্শন মিলেছে।
পাহাড় জুড়ে অর্ধশতাধিক মুড়া বা টিলা: লালমাই-ময়নামতি পাহাড় জুড়ে রয়েছে অর্ধশতাধিক মুড়া বা টিলা। এ পাহাড়শ্রেণীতে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তি বা কীর্তির ধ্বংসাবশেষও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- রাণী ময়নামতির প্রাসাদ বা দুর্গ, সেনানিবাসের হাসপাতালের (সিএমএইচ) মুড়া, আনন্দ রাজার বাড়ি, চারপত্র মুড়া, বৈরাগী মুড়া, কোটিলা মুড়া, আনন্দ বিহার, ভোজ রাজার বিহার বা বাড়ী, ইটাখোলা মুড়া, কোটবাড়ী মুড়া (কুমিল্লা একাডেমির মুড়া), নীলাচল পাহাড়, রূপবান কন্যার বিহার, শালবন বিহার বা শালবন রাজার বাড়ি, হাতিগাড়া মুড়া, উজীরপুরা মুড়া, পাক্কা মুড়া, চিলা মুড়া, রূপবান মুড়া, বলাগাজী মুড়া, চন্ডীমুড়া। আরও রয়েছে- নিরঞ্জন মুড়া, খাছার মুড়া, হোগলি মুড়া, আদিনা মুড়া, সবুরা মুড়া, বড়গাছ মুড়া, অর্জুনখোলা মুড়া, কালি দাসের মুড়া, চেল্লা মুড়া, ফকির মুড়া, আব্বাস আলী মুড়া, সিঙ্গারা মুড়া, সেনানিবাসের বাঙলার মুড়া, এক্সিকিউটিভ অফিসার বাঙলার মুড়া, গাবগাছ মুড়া, টাক্কা মুড়া, পশ্চিম ভোজ বিহারসহ অর্ধশতাধিক টিলা বা মুড়া প্রাচীন কীর্তি ও সভ্যতার নিদর্শন আজও বহন করে চলছে।
লালমাই-ময়নামতিতে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু: লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলে খনন কার্যের ফলে অসংখ্য মূল্যবান প্রত্নবস্তু উদ্ধার হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১২টি তাম্রশাসন, ৪শ’ এর অধিক স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য ব্রোঞ্জ ও প্রস্তর নির্মিত মূর্তি, মাটির তৈরি অসংখ্য নিবেদন স্তূপ ও সীল, অসংখ্য পোড়া মাটির ফলক, স্বর্ণ-রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ নির্মিত অলংকার, মূল্যবান পাহাড়ের গুটিকা, প্রস্তর যুগের অস্ত্রশস্ত্র, ধাতু ও মাটির তৈরি অসংখ্য হাঁড়ি-পাতিল ও অন্যান্য পাত্রসহ প্রাচীন কীর্তি ও সভ্যতার অনেক নিদর্শন। পাহাড়ের শালবন বিহারে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধমন্দির, মূর্তি ও টেরাকোটার ফলক। এসব বলে দেয় ‘লালমাই-ময়নামতি’ যেন শুধুই পাহাড় নয় প্রাচীন সভ্যতা ও প্রত্নতত্ত্বের এক অমূল্য ভান্ডার। ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মো. আহমেদ আবদুল্লাহ্ জানান, লালমাই পাহাড়ে ৫৫টি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইড রয়েছে। তবে এর মধ্যে ২৩টি খননযোগ্য এবং এগুলো থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু পাওয়ার আশা রাখা যায়।
পাহাড়ি এলাকা জুড়ে প্রাচীন দীঘি-পুষ্করিণী: লালমাই পাহাড়ি এলাকা ও এর আশপাশে অসংখ্য প্রাচীন দীঘি-পুষ্করিণীর অস্তিত্ব দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- দ্যুতিয়ার দীঘি, সুঙ্গ দীঘি, মহীর দীঘি, জয়ঠমের দীঘি, হবলুয়া দীঘি, লাল দীঘি, ভোজ রাজার দীঘি, আনন্দ রাজার দীঘি, শালবন রাজার দীঘি, পদুয়ার দীঘি, ধৈন্যাখোলার দীঘি- ইত্যাদি।
যেভাবে ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে এ পাহাড়: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘ময়নামতি’ পাহাড়ে স্থাপন করা হয় ব্রিটিশ সেনানিবাস। সেজন্য কুমিল্লার বিমান বন্দর ও যুদ্ধের কাজে অনেক রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর তৈরি করা হয়। সেসব কাজে জরুরি ভিত্তিতে অসংখ্য ইটের প্রয়োজন হয়। ঠিকাদারেরা খবর পেল যে, লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়ে অসংখ্য ইট আছে। তারা ইট সংগ্রহের কাজে লেগে গেল। সমগ্র পাহাড়ি এলাকায় যত কীর্তি ছিল সবগুলো থেকে তারা ইট নিয়ে গেল। ইটের সঙ্গে তারা পেল অসংখ্য প্রাচীন মুদ্রা, পাথর ও ব্রোঞ্জের তৈরি মূর্তি ও সিল, পোড়া মাটির চিত্রফলকসহ অসংখ্য প্রত্ন সম্পদ।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পরিদর্শন: গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রাচীন প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনসমৃদ্ধ লালমাইয়ের কোটবাড়ি এলাকার শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা, তার স্ত্রী মিসেস গ্রেস মজীনাসহ সফরসঙ্গীরা। পরদিন তিনি লালমাই পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃিশল্প কেন্দ্ভ্র ইনফরমেশন শাখার প্রধান মেরিনা ইয়াসমিন জানান, কুমিল্লার মৃিশল্প নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রতিবেদন দেখে তিনি তা পরিদর্শনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং কুমিল্লা সফরসূচিতে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তহিদুল ইসলাম জানান, পাহাড়ের দেখভাল করার সার্বিক দায়িত্ব জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতরের। লালমাই পাহাড়ে বন বিভাগের জায়গা থেকে বা টিলা থেকে মাটি কাটা হয় না। কেউ কাটলে বা অবৈধভাবে দখল করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল বলেন, আমি এ জেলায় নতুন এসেছি। ব্যক্তি মালিকানার ভূমি দাবি করে লালমাই পাহাড়ের কয়েকটি স্থানের টিলা কেটে মাটি বিক্রির কথা জেনেছি। পাহাড় রক্ষার জন্য মোবাইল টিম পরিচালনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতিমধ্যে ময়নামতি পাহাড়ের একটি উঁচু টিলার মাটি কেটে নেয়ার ঘটনায় ময়নামতি ইউনিয়ন তহশিলদারসহ মাটি বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, প্রত্নতত্ত্বের এক অমূল্য ভান্ডার কুমিল্লার এই লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ি অঞ্চল। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমৃদ্ধ এ পাহাড়ের নান্দনিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসন, রাজনীতিক, পাহাড়ি ভূমির মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক হতে হবে।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs