সর্বশেষ সংবাদ :

টাঙ্গাইলে তিন মেয়েসহ মাকে পুড়িয়ে হত্যা

Share Button

1412785739.

রিপোর্টঃ-মোঃ সফিকুর রহমান সেলিম
ঢাকা, ০৮ অক্টোবর ২০১৪।

টাঙ্গাইল জেলা ও মির্জাপুর উপজেলা সংবাদদাতা : বিয়ের প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় মা ও তিন মেয়েকে ঘরে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে প্রবাস ফেরত বখাটে যুবক জাহাঙ্গীর হোসেন (২৭)। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ১০নং গোড়াই ইউনিয়নের দক্ষিণ সোহাগপাড়া গ্রামে গত সোমবার গভীর রাতে এ অমানবিক ও পৈশাচিক হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনার পর পুরো এলাকাসহ ঐ গ্রামে চলছে শোকের মাতম। নিহত হাসনার ভাই মোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে বখাটে জাহাঙ্গীরকে প্রধান আসামী করে আরও ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মির্জাপুর থানায় হত্যা মামলা করেছে। কিন্তু ঘটনার দুই দিন পার হলেও মূলহোতা জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীরা কেউ গ্রেফতার হয়নি। তবে তার ভাই আবু হানিফ (২২) ও বন্ধু শুসান্তকে পুলিশ গতকাল রাতে গ্রেফতার করেছে। স্বজন হারানোদের বুকফাটা আর্তনাদ আর আহাজারিতে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আসছে।
নবম শ্রেণীর ছাত্রী মনিরা বিয়ের প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় সিংগাপুর প্রবাস ফেরত বখাটে যুবক জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীরা মিলে ঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে রাতের আঁধারে পুড়িয়ে পৈশাচিক ভাবে হত্যা করেছে মা ও তার বাক প্রতিবন্ধী মেয়েসহ একই পরিবারের চারজনকে। এ রকম পৈশাচিক ও অমানবিক ঘটনা এর আগে কখনো এ এলাকায় ঘটেনি বলে এলাকার লোকজন ও নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করেছে। একই পরিবারের মা মেয়েসহ চার জনের নিহতের ঘটনায় পুরো এলাকায় চলছে শোকের মাতম। হাজার হাজার লোকজন এই বীভৎস ও নৃশংস ঘটনা এক নজর দেখার জন্য ঐ বাড়িতে ছুটে আসছে। মির্জাপুর উপজেলার দক্ষিণ সোহাগপাড়া গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী মজিবর রহমানের স্ত্রী হাসনা বেগম (৩০), বড় মেয়ে নবম শ্রেণীর ছাত্রী মনিরা (১৫), মেজো মেয়ে বাক প্রতিবন্ধী মীম (১২) এবং ছোট মেয়ে মলি (৮) কে ঘরে পেট্রোল দিয়ে অমানবিকভাবে পুড়িয়ে মেরেছে বখাটে জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীরের পিতার নাম বাহার উদ্দিন বাহার। বাড়ি একই উপজেলার দক্ষিণ সোহাগপাড়া গ্রামে। গতকাল বুধবার দক্ষিণ সোহাগপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য । স্বজন হারানোদের বুকফাটা কান্নায় চার পাশের বাতাস ভারী হয়ে আসছে।
পরিবারের চার জনের হত্যার ঘটনার খবর পেয়ে বুধবার রাত দুইটার দিকে প্রবাসী মজিবর রহমান বাড়িতে ছুটে এসেছেন মালয়েশিয়া থেকে। তার বুকফাটা কান্নায় ও আহাজারিতে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আসছে। তার একটাই প্রশ্ন, তোমরা আমার কলিজার ধন বুকের মানিক তিন মেয়ে এবং স্ত্রী হাসনাকে এনে দাও। তাকে সান্ত¦ত্মনা দেওয়ার মত ভাষা যেন কারও নেই। পরিবারের সবাই যেন বাকরুদ্ধ। নিহত হাসনার বৃদ্ধ শ্বশুর চান মিয়া ফকির, পিতা আলাল উদ্দিন ও স্বামী মজিবর রহমান বার বার মূর্ছা যাচ্ছে।
গোড়াই ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আদিলুর রহমান খান আদিল, মির্জাপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক ভিপি আবু আহমেদ, ছাত্র নেতা আবুল কাশেম, ব্যবসায়ী বাবুল সিকদার ও নিহত হাসনা বেগমের বৃদ্ধ পিতা আলাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর প্রায় ৮ বছর যাবৎ সিংগাপুর থাকে। গত দুই বছর পূর্বে সে দেশে ছুটিতে এলে মনিরার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বিয়ের কথা হয়। মনিরা তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। বিয়ের প্রস্তাব করে ছুটি শেষে জাহাঙ্গীর আবার সিংগাপুর চলে যায়। বিয়ে করার জন্য গত আড়াই মাস পূর্বে সে ছুটিতে বাড়ি আসে। বাড়িতে এসে মনিরাকে এবং তার পরিবারকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। কিন্তু মনিরা এবং তার পরিবার এ বিয়েতে রাজী নয় বলে সাফ জানিয়ে দেয়। মনিরা এখন গোড়াই উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী । পিতা মাতা এবং পরিবারের ইচ্ছা ছিল মনিরা পড়াশোনা করে মানুষের মত মানুষ হয়ে পরিবারের হাল ধরবে। কিন্তু সে আশা আর হলো না। বিয়ের জন্য জাহাঙ্গীর চাপ সৃষ্টি করলে এ নিয়ে গ্রামে একাধিক বিচার সালিশও হয়েছে।
ঐ ঘটনার প্রতিশোধ নিতে মঙ্গলবার রাতে স্থানীয় একটি পেট্রোল পাম্প থেকে সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীরা একই এলাকার রিকসা চালক মোহাম্মদ আলীকে দুইশ’ টাকার বিনিময়ে দুটি গ্যালনে ভর্তি করে ২০ লিটার পেট্রোল কিনে নিয়ে আসে। রাত আনুমানিক দুইটার দিকে ঐ বাড়ির এক তলা পাকা ভবনের দরজা বন্ধ করে জানালা দিয়ে পেট্রোল নিক্ষেপ করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে দগ্ধ হয়ে মা ও তিন মেয়ে ঘটনাস্থলেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস খবর পেয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর থেকেই ঘাতক জাহাঙ্গীর ও তার পরিবার ঘরবাড়িতে তালা দিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ পেট্রোল বহনকারী রিকসা চালক মোহাম্মদ আলী (৩৪) ও জাহাঙ্গীরের বন্ধু সুশান্তকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে বলে ওসি গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন। মির্জাপুর থানার সহকারী পুলিশ পরিদর্শক শ্যামল কুমার দত্ত জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে মূলহোতা জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আবু হানিফকে বালিয়াজান এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ময়না তদন্ত শেষে নিহতদের লাশ জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মোহাম্মদ তানবীর ও মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাসুম আহমেদ বলেন, চার জনের নিহতের ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক। ঘটনার পর পরই স্থানীয় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় উদ্ধার কাজ চালানো হয়েছে। ময়না তদন্তের পর নিহত চার জনের লাশ দাফন কাজ সম্পাদনের জন্য প্রশাসন থেকে জন প্রতি ৫ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে। মামলায় যাদের আসামী করা হয়েছে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি প্রদান করা হবে বলে তারা জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে প্রধান আসামী জাহাঙ্গীরের ভাই আবু হানিফকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার অপর আসামীদের গ্রেফতারে বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

Comments are closed.

Scroll To Top
Bangladesh Affairs