চেক ডিজঅনারের মামলায় কারাগারে পাঠানো নিয়ে বিতর্ক

Share Button

রিপোর্টার:-দৈনিক মুক্তকন্ঠ,
০৬ সেপ্টেম্বর. ২০২২। সময : ০৯ ,৫০.PM.

ব্যাংক চেক ডিজঅনার হলে সর্বোাচ্চ এক বছরে জেল এবং চেকে লেখা টাকার তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে। সম্প্রতি হাইকোর্ট চেকের মামলায় কারাগারে পাঠানো সংবিধান পরিপন্থী বলেছেন। আইনটি পরিবর্তনের জন্য জাতীয় সংসদকে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষের আপিলে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেছেন চেম্বার জজ। ১৪ নভেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে মামলাটি পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়েছে। মামলাটি তাই এখনো চলমান। কিন্তু হাইকোর্টের এই রায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এই নিয়ে আইনজীবীরা পক্ষে বিপক্ষে কথা বলছেন।

সাধারণভাবে চেক দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করার একটি চক্র বাংলাদেশে সক্রিয় আছে। বিভিন্ন খাতে পাওনা টাকা, বেতন, পেমেন্ট, সম্মানির বিপরীতে ব্যাংক চেক দেয়ার পর দেখা যায় ওই একাউন্টে টাকাই নেই। প্রচলিত আইনটি ওই ধরনের ঘটনার প্রতিকার পেতে বেশ কাজে দেয়। কিন্তু উল্টো ঘটনাও আছে। একজনের কাছ থেকে চেক নিয়েও তাকে প্রতারণা ও হয়রানির শিকার করা যায় এই আইনে। এটা ব্যবসায়িক লেনদেনে ব্যাংক চেকের ক্ষেত্রে বেশি হয়। কেউ একজন অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ব্যাংক চেক দিলেন। তখন ওই ব্যক্তি যত টাকা পান তার চেয়ে বেশি চেকে লিখে নিল। তারপর চেক ডিজঅনার করিয়ে আদালতে মামলা করে দেয়।

আবার দুই ব্যক্তি একটি কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেন। একটি নির্দিষ্ট সময় কাজটি করে দেওয়ার বিনিময়ে প্রথম ব্যক্তি দ্বিতীয় ব্যক্তিকে আগাম চেক দিলেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি কাজটি করেননি বা নির্ধারিত সময়ে করেননি। স্বাভাবিক কারণেই প্রথম ব্যক্তি চেকটি ক্যাশ না করার জন্য ব্যাংককে অ্যাডভাইস করবেন। কিন্তু তারপরও ওই চেকটি তিনি ডিজঅনার করিয়ে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

চেক ডিজঅনার কয়েকভাবে হতে পারে। ১. চেকের সমপরিমাণ টাকা একাউন্টে না থাকা বা কম থাকলে। ২. চেক ক্যাশ না করার জন্য চেক দাতার অ্যাডভাইস ৩. চেকের স্বাক্ষর না মেলা ৪. চেকের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে। এখানে বলে রাখা ভালো একটি চেকের মেয়াদ থাকে সর্বোচ্চ ৬ মাস।

চেক ডিজঅনার মামলায় শাস্তি হলো এক বছর মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে বর্ণিত অর্থের তিন গুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। আর এই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে জরিমানার অর্ধেক টাকা জমা দিয়ে আপিল করতে হবে। এই মামলাটি জামিন অযোগ্য।

গত ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের একক বেঞ্চ একটি মামলা রায়ে চেক ডিজঅনারের মামলায় কাউকে জেলে পাঠানোকে সংবিধান পরিপন্থী বলেন। আদালতের অভিমত, এটা সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। আদালত এনআই অ্যাক্টের (নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ) ১৩৮ ধারা পরিবর্তনের জন্য সংসদকে পরামর্শ দেন। ধারাটি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত আদালত মামলাগুলো নিস্পত্তির একটি গাউড লাইন পূর্নাঙ্গ রায়ে দেয়ার কথা বলেন।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট সংশোধন করে কারাদণ্ডের বিধান করা হয়। চেক একটি নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মনজুরুল হক বলেন, এই আইনটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা করে দিয়েছে। তারা ঋণের বিপরীতে মর্টগেজ ছাড়াও অনেকগুলো ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর নিয়ে রাখেন। পরে লোন পরিশোধে ব্যর্থ হলে চেকে তাদের ইচ্ছে মত টাকার অংক বসিয়ে মামলা করে দিতে পারেন। আর তখন জেলের ভয়ে ঋণগ্রহীতারা দ্রুত টাকা দিয়ে দেন। এতে টাকা আদায় সহজ হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর নেয়াটা একটি ভয়ংকর বিষয়। এর মাধ্যমে প্রতারণা হতে পারে এবং হচ্ছেও। তবে সাধারণ মানুষ চেকের মাধ্যমে তাদের পাওনা টাকায় আদায় এই আইনের কারণে সহজে করতে পারে। প্রতারণার সুযোগ কম থাকে।

তার কথা, ব্যাংক ছাড়াও চেকে ব্যবসায়িক লেনদেনে এই আইনটির অপব্যবহার হচ্ছে। তাই আমি মনে করি কারদণ্ডের বিধানটি বাদ দেওয়া উচিত।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, চেকের স্বাক্ষর না মিললেও চেক ডিজঅনার হবে। এখন কেউ অন্যের চেক চুরি করে নিজে স্বাক্ষর দিয়ে চেক ডিজ-অনার করিয়েও মামলা করতে পারেন। তার কথা, আমাদের কাছে অনেক মামলা আসে সেগুলো আসলে এই আইনটি ব্যবহার করে হয়রানির মামলা।

সাবেক বিচারক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, মূল বিষয় হলো চেকের টাকা পাওয়া নিয়ে। আর এটা সিভিল অপরাধ। কিন্তু বাংলাদেশে এটা এখন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আমাদের দেশে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, যেকোনো অপরাধে জেলে পাঠালেই সমস্যার সমাধান হবে। এটা আসলে ঠিক নয়। ১৯৯৪ সালে এনআই অ্যাক্ট সংশোধনের আগে কি তাহলে চেক ডিজঅনার হলে প্রতিকার পাওয়া যেত না? আইনে আরো দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। আর এখন কমপক্ষে দুই বছর লাগে।

তিনি বলেন, ১৮৬১ সাল থেকেই আইন আছে। সিপিসির অর্ডার ৩৭ রুল-২ আছে। তাতে ডিজঅনার হওয়া চেকের টাকা উদ্ধারে সর্বোচ্চ দুই মাস লাগে। কারণ সিভিল মামলা করার ১৪ দিনের মধ্যেই সমন এবং শুনানি বাধ্যতামূলক। আদালত বিবাদীর উত্তরে সন্তুষ্ট না হলে ওই তারিখেই ডিক্রি দেবেন।

সাধারণ মানুষ তো এই চেক নিয়ে প্রতারণার শিকারও হয়। তারা টাকা পায় না। এর জবাবে তিনি বলেন, আগের আইনটি সাধারণ মানুষ তেমন জানেন না। তাই প্রতিকার পান না। এই আইনে মামলা করে আমি বার বার পক্ষে রায় পেয়েছি।

এই দুই আইনজীবীর কথা, একই সঙ্গে কারাদণ্ড এবং চেকের তিনগুণ পরিমাণ টাকা আসলে ন্যায় বলে মনে হয় না। এর ফলে চেক নিয়ে হয়রানি আরো বেড়েছে। এমনকি জোর করে চেকে সই নেয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।

আজিজুর রহমান দুলু একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় স্ত্রী তার স্বামীর চেক গোপনে নিয়ে তাতে টাকার অংক বসিয়ে নিজে স্বাক্ষর করে ব্যাংকে জমা দিয়েছে। স্বাক্ষর না মেলায় চেক ডিজঅনার হয়েছে। তিনি মামলা করেছেন চেক ডিজঅনারের।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।