করতোয়ার তীরে স্বজনহারাদের বিলাপ

Share Button

রিপোর্টার:-দৈনিক মুক্তকন্ঠ,
২৬ সেপ্টেম্বর. ২০২২। সময : ১০ ,০০.PM.

করতোয়ায় কত জল- তা যেমন মাপা যায় না, তেমন স্বজনহারা শত শত মানুষের অশ্রুও পরিমাপ অযোগ্য। আজ সোমবার সারাদিন পঞ্চগড়ে করতোয়া নদীর তীরে দেখা গেছে বিমর্ষ মানুষের ভিড়। তারা নৌকাডুবিতে নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কেউ কেউ পেয়েছেন লাশ, কেউ পাননি। এখনও স্বজনদের বিলাপে ভারী এই নদী তীর।

নৌকাডুবির ঘটনায় সোমবার সারাদিনই বেড়েছে মৃতের সংখ্যা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একে একে ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এরআগে রোববার দুর্ঘটনার পর ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়। সোমবার রাত নয়টা নাগাদ মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ জনে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে ২৩ জন নারী এবং ১৩ জন শিশু রয়েছে। এখনও ৩৫ জনের মতো নিখোঁজ বলে প্রশাসন জানিয়েছে। তাদের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার করতোয়া নদীতে রোববার এই মর্মান্তিক নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এরপর সময় যত গড়াচ্ছে নিখোঁজদের জীবিত ফিরে আসার আশা কমছে।

সোমবার সূর্য ওঠার পর থেকেই ঘটনাস্থল করতোয়ার আউলিয়া ঘাট ও এর আশপাশে নিজ উদ্যোগে নিখোঁজদের খোঁজ শুরু করেন স্বজনেরা।  স্বজনের খোঁজে কেউ কেউ পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছোটেন। কেউ বোনের জন্য গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদেন, কেউ ভাইয়ের লাশের সামনে মাতম করেন। করতোয়া পাড়ে স্বজন হারানোর এই বিলাপে চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না কেউ।

নৌকাডুবির এই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে ফেরেন বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের আরাজি শিকারপুরের গৃহবধূ আলো রাণী। কিন্তু তিনি তার দুই শিশু সন্তানকে খুঁজে পাচ্ছেন না। এছাড়া মা, বোন, ভাগ্নি ও জা (দেবরের স্ত্রী) মারা গেছেন তার। বিলাপ করে তিনি সমকাল প্রতিবেদককে বলেন, হামার দুই সন্তানক পাচ্ছি না, এলা মুই কি নিয়া বাঁচিম? মুই মরি গেলেও বেটি দুইটা বাঁচে থাকিলে ভালো হইল হয়। ভগবান, হামার কী হইল!

পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী উপ পরিচালক শেখ মো. মাহাবুবুল আলম সমকালকে বলেন, সকাল থেকে পঞ্চগড় ও আশপাশের জেলার আটটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট উদ্ধারকাজ করছে। এর বাইরে রংপুর, কুড়িগ্রাম ও রাজশাহী থেকে তিনটি ডুবুড়ি দলে মোট ৯ জন উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন।

রোববার দুপুরে বোদা বদ্বেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া উৎসব উৎযাপন করতে নৌকায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী মাড়েয়া এলাকা থেকে বদ্বেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠায়  আওলিয়া ঘাটের করতোয়া নদীর মাঝে যাত্রীসহ ডুবে যায় নৌকাটি।

স্থানীয়রা জানান, ওই নৌকার ধারণক্ষমতা ছিল ৫০-৬০ জনের। তিন গুণের বেশি যাত্রী নিয়ে যাত্রার কিছুদূর যাওয়ার পরই দুলতে থাকে নৌকাটি। এ সময় মাঝি নৌকাটি তীরে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আতঙ্কিত যাত্রীদের হুড়াহুড়িতে নৌকাটি ডুবে যায়। যাত্রীদের অধিকাংশ সনাতন ধর্মের অনুসারী। তারা শারদীয় দুর্গোৎসবের মহালয়া উপলক্ষে ওই মন্দিরে যাচ্ছিলেন।

সোমবার যাদের মরদেহ উদ্ধার হলো 

আজ যে ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে তারা হলেন- হাসান আলী (৭০), শ্যামলী রানী (১৪), লক্ষ্মী রানী (২৫), অমল চন্দ্র (৩৫), শোভা রানী (২৭), দীপঙ্কর (৩), পিয়ন্ত (২.৫), রুপালি ওরফে খুকি রানী (৩৫), প্রমীলা রানী (৫৫), ধনবালা (৬০), সুনিতা রানী (৬০), ফাল্কগ্দুনী (৪৫), প্রমীলা দেবী, জ্যোতিশ চন্দ্র (৫৫), তারা রানী (২৫), সানেকা রানী (৬০), সফলতা রানী (৪০), বিলাস চন্দ্র (৪৫), শ্যামলী রানী ওরফে শিমুলি (৩৫), উশোশি (৮), তনুশ্রী (৫), শ্রেয়সী, প্রিয়ন্তী (৮), সনেকা রানী (৬০), ব্রজেন্দ্র নাথ (৫৫), ঝর্ণা রানী (৪৫), দীপ বাবু (১০), সুচিত্রা (২২), কবিতা রানী (৫০), বেজ্যে বালা (৫০), দীপশিখা রানী (১০), সুব্রত (২), জগদীশ (৩৫), যতি মৃন্ময় (১৫), গেন্দা রানী, কনিকা রানী, সুমিত্রা রানী, আদুরী (৫০), পুষ্পা রানী, প্রতিমা রানী (৫০), সূর্যনাথ বর্মণ (১২), হরিকেশর বর্মণ (৪৫), নিখিল চন্দ্র (৬০), সুশীল চন্দ্র (৬৫), যূথী রানী (১), রাজমোহন অধিকারী (৬৫), রূপালী রানী (৩৮), প্রদীপ রায় (৩০), পারুল রানী (৩২) এবং প্রতিমা রানী (৩৯)।